14/08/2026
গাড়িতে করে আদালতে হাজিরা দিতে যাচ্ছিল সুখরঞ্জন বালি। মাওলানা দেলোয়ার হোসাইন সাঈদীর পক্ষে সাক্ষ্য দেয়ার জন্যেই যাচ্ছিল সে। গাড়িতে তার সাথে দুজন আইনজীবীও ছিল তখন।
কিন্তু আদালতের গেইটে ঢুকার আগমুহূর্তে সাদা পোশাক পড়া কয়েকজন লোক এসে তাদের গাড়ি আটকে ফেলে। তারপর টেনেহিঁচড়ে গাড়ি থেকে নামায় সুখরঞ্জন বালিকে।
সাথে থাকা আইনজীবীরা বাঁধা দিচ্ছিল কিন্তু তারা এতগুলো লোকের সাথে পেরে উঠছিল না। তারপর তড়িঘড়ি করে অন্য একটা গাড়িতে তুলে ফেলা হয় তাকে।
গাড়িতে উঠিয়েই কালো জম টুপি দিয়ে চোখমুখ বেঁধে ফেলা হয়। তারপর এক টানে গাড়ি চলতে থাকে অনেকক্ষণ ধরে।
সুখরঞ্জন বুঝতে পারছিল না এরা কারা, কেনই বা তাকে এভাবে তুলে নিয়ে যাচ্ছে। তাই গাড়িতে থাকা অবস্থাতেই অনেকবার আর্তনাদ করে জিজ্ঞেস করতে থাকে- আপনেরা কারা? আমারে তুইলা নিয়া যাইতাছেন ক্যান?
গাড়িতে থাকা সাদা পোশাকধারী কেউই কোন উত্তর দিচ্ছিল না বরং সুখরঞ্জন যতবার কোনকিছু জিজ্ঞেস করেছিল ততবারই তাকে চড় থাপ্পড় দিচ্ছিল, কিল ঘুষি দিয়ে চুপ করিয়ে রাখছিল।
অনেকক্ষণ যাবত গাড়ি চালানোর পর সুখরঞ্জনকে গাড়ি থেকে টেনেহিঁচড়ে নামিয়ে হাঁটানো হয়। সিঁড়ি দিয়ে নামিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় গোয়েন্দা বাহিনীর আন্ডারগ্রাউন্ড ফ্লোরের আয়নাঘরে।
আয়নাঘরে নিয়ে প্রথম দুইদিন তাকে একটা রুমে বন্দী করে রাখা হয়। ওই রুমে তেমন কোন আলো বাতাস আসতো না, মৃদু আলো আসতো শুধু। বড় বড় এডজাস্ট ফ্যান লাগানো ছিল দেয়ালের উপরের দিকে।
দরজার নিচ দিয়ে পঁচা বাসি খাবার দেয়া হতো তাকে। যতবারই খাবার দিতে আসতো ততবারই সুখরঞ্জন চিৎকার করে করে জিজ্ঞেস করতো- আমারে ক্যান তুইলা আনছেন? আপনেরা কারা? কবে ছাড়বেন আমারে?
কিন্তু কোন উত্তর আসতো না।
এভাবে টানা দুইদিন এই রুমটাতে বন্দী করে রাখা হয় তাকে।
দুইদিন পর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় অন্য একটা রুমে। সেখানে নেয়ার পর সে দেখতে পায় রুমে বেশ কয়েকজন অফিসার বসা আছে। রুমের চারদিকে অনেকগুলো ক্যামেরা লাগানো।
তারপর সুখরঞ্জনকে বসিয়ে গোয়েন্দা বাহিনীর অফিসাররা জিজ্ঞেস করে- মুক্তিযুদ্ধের সময় তোর ভাইয়ের হ*ত্যায় সাঈদী হুজুর জড়িত ছিল না?
সুখরঞ্জন না করে।
সে বলে- আমার ভাইরে যখন মারা হইছিল তখন আমি বাড়িতেই লুকাইয়া ছিলাম। ওদেরকে আমি দেখছি। যারা আমার ভাইরে মারেছে ওদেরকে দেখলে আমি চিনব। ওদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যও দিতে পারব।
সুখরঞ্জনের এ কথায় গোয়েন্দা অফিসাররা প্রচন্ড রেগে যায়। তার গালে জোরে জোরে থাপ্পড় দিয়ে বলে- তোকে সাঈদীর বিরুদ্ধেই সাক্ষ্য দিতে হবে।
সুখরঞ্জন তখন পুনরায় বলে- আমার ভাইরে মারার সময় সাঈদী হুজুররে তো ওইখানে দেখি নাই। উনি আমাদের এলাকায় আসছেন ভাইয়ে মরার আরও অনেক বছর পরে। উনি এমপিও হইছেন এলাকায়, তখন উনারে চিনছি। উনি তো মারে নাই আমার ভাইরে।
গোয়েন্দা বাহিনী অফিসার এবারেও রেগে যায়। রেগে গিয়ে হাতের ইশারায় একজনকে ইলেকট্রিক শকের যন্ত্রপাতি আনতে পাঠায়।
ততক্ষণে আরেকজন সুখরঞ্জনকে মোটা লাঠি দিয়ে পিটাতে থাকে, পায়ের তালুতে বেত দিয়ে মারতে থাকে।
ইলেকট্রিক শকের যন্ত্রপাতি আনার পর তার শরীরে যন্ত্রটা ফিট করে অনেকক্ষণ যাবত গোপনাঙ্গসহ সেন্সিটিভ সব জায়গায় শক দিতে থাকে আর জিজ্ঞেস করতে থাকে- সাঈদী হুজুরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিবি কি-না বল?
সুখরঞ্জন প্রতিবারই না করে। এজন্যে তার শকের পরিমাণ বাড়িয়ে দিতে থাকে গোয়েন্দা অফিসাররা।
এভাবে টানা কয়েকদিন অমানুষিক নির্যাতন করার পরও গোয়েন্দা বাহিনীর অফিসাররা যখন বুঝতে পারে মারধর করে সুখরঞ্জনের কাছ থেকে সাঈদী হুজুরের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য নেওয়া যাবে না তখন তারা অন্য প্ল্যান করে।
এর পরদিন অন্য একটা রুমে নিয়ে টেবিলভর্তি টাকা দেখানো হয় সুখরনঞ্জনকে।
তারপর বলা হয়- তোর পরিবারটা গরিব, তুই যদি হুজুরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিস তাহলে এখান থেকে ছাড়াও পাবি, টাকাগুলোও পাবি। তোর পরিবার আরামে থাকতে পারবে। সাক্ষ্য দিবি কি-না বল?
সুখরঞ্জন তখন জিজ্ঞেস করে- আমি তো মূর্খসুক্ষ মানুষ এতকিছু বুঝি না। হুজুরের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিলে আপনেরা কি উনারে রাজাকার সাজাইয়া ফাঁ*সি দিয়া দিবেন?
অফিসাররা তখন হাসতে হাসতে বলে- তোর এতকিছু জানতে হবে না।
সুখরঞ্জন কাঠমিস্ত্রী, গরিব মানুষ। আইনের এত মাইরপ্যাচ সে বুঝে না। কিন্তু হুজুরের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে ওরা যে হুজুরের সাথে বাজে কিছু করবে সেটা বুঝতে পারে।
তাই মনে মনে সিদ্ধান্ত নেয় ওরা যতযাই করুক না কেন সে মিথ্যা সাক্ষ্য দিবে না।
এভাবে অনেকক্ষণ যাবত গোয়েন্দা অফিসাররা সুখরঞ্জনকে বুঝাতে থাকে কিন্তু সে রাজি হয় না। রাজি না হওয়ায় তাকে আবারও বেধড়ক মারধর করতে থাকে এবং ইলেকট্রিক শক দিতে থাকে।
একপর্যায়ে গোয়েন্দা অফিসাররা যখন বুঝতে পারে ওকে মারধর কিংবা টাকার লোভ দেখিয়েও কাজ হবে না তখন সুখরঞ্জনকে বর্ডারের ওপারে পাচার করে দেয়ার প্ল্যান করে যাতে সাঈদী হুজুরের পক্ষেও সাক্ষ্য দিতে না পারে সে।
তার পরদিন সকালের দিকে চোখ বেঁধে সুখরঞ্জনকে আয়নাঘর থেকে বের করা হয়।
সে জিজ্ঞেস করে- আমারে কই নিয়া যাইবেন?
গোয়েন্দা অফিসাররা বলে- তোকে তোর দেশে দিয়ে আসব, তুই বাড়ি চিনে যেতে পারবি?
বাড়ির কথা শুনে সুখরঞ্জন খুশি হয়। সে বলে বাগেরহাটের কাছাকাছি নামাই দিয়া আসলে আমি চিনে যাইতে পারমু।
তারপর গাড়িতে তুলে অনেকক্ষণ যাবত তাকে নিয়ে যাওয়া হয় অচেনা পথে। একপর্যায়ে গাড়ি থামিয়ে চোখ খুলে দেয়া হয় তার। তারপর সামনে এগোতে বলে।
সুখরঞ্জন বুঝার চেষ্টা করে এটা তার বাড়ি বাগেরহাট এলাকা কি-না। কিন্তু সে দেখে এটা বাগেরহাট না, অন্য একটা বর্ডার এলাকা। সামনেই ভারতীয় বিএসএফ বাহিনী।
বাংলাদেশী গোয়েন্দা বাহিনীরা জোর করে সুখরঞ্জনকে তুলে দেয় ভারতীয় বাহিনীর হাতে। সুখরঞ্জন বারবার কেঁদে কেঁদে বলতে থাকে- আমাকে এদের হাতে দিয়েন না, দরকার হইলে মাইরা ফেলেন।
কথাগুলো বলতে বলতেই মাটিতে পড়ে গড়াগড়ি করতে থাকে সে।
তবুও জোর করেই দুইজন বাংলাদেশী বিজিবি বাহিনী এবং ৬-৭ জন গোয়েন্দা বাহিনীরা মিলে ভারতীয় বিএসএফের হাতে তুলে দেয় সুখরঞ্জনকে।
ভারতীয় বিএসএফের হাতে তুলে দেয়ার পর ওরা মোটা দড়ি দিয়ে সুখরঞ্জনের হাত পিছন দিক দিয়ে বেঁধে ফেলে। তারপর মোটা একটা লাঠি দিয়ে হাতের কনুই এবং সারা শরীরে মারতে থাকে।
সুখরঞ্জন ভারতীয় বাহিনীকে বাংলায় বারবার বুঝাতে থাকে- তাকে জোর করে এখানে আনা হয়েছে, সে নিরপরাধ। কিন্তু ভারতীয় বাহিনীরা তার কথা শুনে না। হিন্দিতে কথা বলে উল্লাস করতে করতে তাকে মারতে থাকে।
তারপর সেখান থেকে তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ভারতের পশ্চিমবঙ্গের বশিরহাট জেলে। এই জেলেও অমানুষিক নির্যাতন করা হয় তার উপর।
সুখরঞ্জন ভেবেছিল আর কোনদিন বাংলাদেশে ফিরতে পারবে না সে। তাকে হয়তো জেলেই মেরে ফেলবে।
তারপর বশিরহাট জেল থেকে তাকে আনা হয় দমদম জেলে। এই জেলে আসার পর এক বন্দীর সাথে পরিচয় হয় তার। তার বাড়িও ছিল বাংলাদেশে। সুখরঞ্জন ওই বন্দীকে নিজের সব পরিচয় এবং ঠিকানা জানিয়ে রাখে।
বছরখানেক পর ওই বন্দী জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বাংলাদেশে ফিরে আসতে পারে এবং পরে সুখরঞ্জনের পরিবারের ঠিকানা খুঁজে বের করে। তারপর তাদেরকে জানায় যে সুখরঞ্জন বেঁচে আছে এবং ভারতের দমদম জেলে আছে।
এতদিন সুখরঞ্জনের ছেলেমেয়েরা ধরেই নিয়েছিল তাদের বাবা বেঁচে নেই। এবার বাবার বেঁচে থাকার খবের তারা প্রচন্ড খুশি হয় এবং মানবাধিকার সংস্থার সাথে যোগাযোগ করে।
পরে মানবাধিকার সংস্থার সহযোগিতায়, সুপ্রিম কোর্টের আদেশে ২০১৮ সালে দেশে ফিরানো হয় তাকে। পরবর্তীতে সুরঞ্জন নিজ মুখেই পুরো ঘটনার জবানবন্দি দিয়েছিল।
সুরঞ্জন দেশে ফিরতে পেরেছিল দীর্ঘ ৫ বছর পর কিন্তু ততদিনে হাসিনা এবং তার পালিত গোয়েন্দা অফিসাররা তাদের উদ্দেশ্যটা পূরণ করে ফেলেছিল। তারা ঘুটু করে সাঈদি হুজুরকে জেলবন্দী করে রেখেছিল।
বহু মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে বেগম খালেদা জিয়া পর্যন্ত বলে গিয়েছিল সাঈদি হুজুর নির্দোষ ছিলেন।
কিন্তু তবুও রাজাকার প্রমাণ করে ফাঁ*সি দিতে না পেরে জেলে অমানুষিক নির্যাতন এবং খাবারের সাথে স্লো পয়জন মিশিয়ে তিলে তিলে কষ্ট দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল এই মানুষটাকে।
২০২৩ সালের আজকের এই দিনেই মৃত্যুবরণ করেছিল সাঈদী হুজুর। আজকে তার তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী।
তাকে হয়তো এদেশের মানুষ সম্মান দেখাতে পারেনি কিন্তু সুখরঞ্জন বালি নামের গরিব লোকটা দেখাতে পেরেছিল।
গরিব সুখরঞ্জন কাঠমিস্ত্রীর কাজ করতো। বউ এবং এক ছেলে, এক মেয়ে নিয়ে তার অভাবের সংসার ছিল। কিন্তু তবুও টাকার লোভে মিথ্যা বলেনি সে।
ছাড়া পাওয়ার পর সবশেষে সুখরঞ্জন বলেছিল- আমি ধরেই নিছিলাম ওরা আমারে মাইরা ফেলবো কিন্তু তবুও হুজুরের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দেই নাই।
কারণ আমি মিথ্যা সাক্ষ্য দিলে হুজুরকে ফাঁ*সি দিয়া দিতো।
সুখরঞ্জন হয়তো তেমন শিক্ষিত না, কিন্তু তার মতো সৎ, সাহসী লোকেরা আছে বলেই দেশটা এখনো টিকে আছে।
হাসিনার আমলে বাহিনীদের কথা না শোনায় সুখরঞ্জনের মতো এমন বহু মানুষকে গুম করা হয়েছে, সাঈদি হুজুরের মতো বহু নিরপরাধ আলেমকে মিথ্যা মামলায় ফাঁ*সি দেয়া হয়েছে।
সুখরঞ্জনের ভাগ্য ভালো বিধায় সে হয়তো বেঁচে ফিরেছে কিন্তু সুখরঞ্জনের মতো আরও বহু মানুষ ফিরতে পারেনি আজও। বহু মানুষের পেট কেটে লা*শ ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে নদীতে।
অথচ তাদের ছেলেমেয়েরা এখনও অপেক্ষায় প্রহর গুণছে আর ভাবছে- হয়তো তাদের বাবাও একদিন ফিরে আসবে
✍️... Ibrahim Khalil Shawon
copu post