29/10/2024
লাশ কাটা ঘরে একদিন
সকাল প্রায় ৯:৩০ মিনিট। আমি তখন নেত্রকোনা সদর হাসপাতালে। অপেক্ষা করছি মৃতদেহবাহী অ্যাম্বুলেন্সের জন্য। আমি একা না, আরো কিছু মানুষ আছে। আমি তাদেরকে তেমন খুব একটা ভালো করে চিনি না। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই আমার শ্বশুর আমাকে সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। আমি একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, এসআই বা ড্রাইভার কারও সাথে কথা হয়েছে কি আপনাদের? তারা আমাকে বলল, না? তবে গতকাল আমাদেরকে এসআই বলেছিলেন হাসপাতালের সামনে যেন সকাল ৯ থেকে ৯:৩০-এর দিকেই থাকি। যাইহোক, আমি বুঝতে বাকি নেই তারা কেমন সচেতন মানুষ, আর এমনি সাদামাটা গ্রাম্য মানুষ। এতকিছু ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে বুঝে না। তখন আমি ভাবলাম, তাদের সাথে আমি আসিনি; বরং আমার সাথেই তারা এসেছে। তাই নিজ দায়িত্বে এসআই-এর নম্বরটা নিলাম এবং ফোন করলাম। আমি আমার পরিচয়টা সংক্ষেপে দিলাম—পরিচয় বলতে শুধু বললাম আমি মৃত ব্যক্তির বাসতি জামাই বলছি। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনারা কি আসছেন? আর না আসলে কতক্ষণ লাগবে আসতে? উনি আমাকে উত্তর দিলেন, “অপেক্ষা করুন, আমরা ৩০ থেকে ৪০ মিনিটের মধ্যে পৌঁছে যাব।” আমি ফোন রেখে সবাইকে অপেক্ষার সময়টা বললাম। ইতোমধ্যে খুব সকালে বাসা থেকে বের হয়েছি, তাই এমনিই একটা লাশ আনতে যেহেতু এসেছি, সকালবেলা নাস্তা এবং অন্য কোনো কিছুর তেমন রুচি ছিল না। তবুও চিন্তা করলাম, আমার জন্য না হোক, সাথে যারা আছে তারাও তো কিছু খায়নি। তাই সবাইকে নাস্তা খাওয়াতে নিয়ে আসলাম। বেশ কিছুক্ষণ জোরাজুরি করার পর তারা গেল নাস্তা করতে। নাস্তা করতে করতে প্রায় এক ঘণ্টা শেষ।এস.আই আর ড্রাইভারের আসার কোনো খবর নেই। শেষমেশ এস.আই এবং ড্রাইভার প্রায় বেলা ১২টা ৪০ মিনিটে পৌঁছাল। আমি জিজ্ঞেস করলাম, লাশ কোথায়? আর আমরা লাশ নিয়ে কখন যেতে পারব? ড্রাইভার বলল, আমার সাথে চলুন, লাশ কাটাঘরে যেতে হবে। এই কথা শুনে আমার সাথে থাকা সবাই মোটামুটি একে অন্যের মুখের দিকে তাকাচ্ছে, যেন ভাবছে, কে যাবে। এ সময় এস.আই বলে উঠল, এত ভাবার সময় নেই। আমার কাজ আছে। কে যাবেন চলেন, আর যদি না যান তাহলে বলুন, আমি চলে যাই। আপনারা ঠিক করুন, কে যাবেন লাশ কাটাঘরে, আর যদি কেউ না যায় তাহলে যার প্রয়োজন তাকেই খবর দিয়ে নিয়ে আসুন, আমি পরে আসব।এই কথা শুনে উনি যখন চলে যাচ্ছিলেন, তখন আমি এস.আই কে বললাম, “চলুন, আমি যাব।” আমার কথা শুনে আমার শ্বশুর আমাকে কিছু বলার চেষ্টা করছিলেন, তবে আমি আর তা শুনিনি। এস.আই, ড্রাইভার আর আমি লাশ কাটাঘরের দিকে যেতে লাগলাম।লাশ কাটাঘরে গিয়ে দেখি কোনো লাশ নেই। আনুমানিক ১৬ থেকে ১৭ বছর বয়সের ছোট আকারের একটা ছেলে বসে আছে। সে মাথা নিচু করে কিছু একটা লিখছে। তখন এস.আই তাকে "দিপু" নামে ডাকলেন... আর তার সামনে তিন পাতার একটি ফাইল দিলেন। ছেলেটি ফাইলটি দেখে তিনটি পাতায় সিল মেরে সাইন ও সিরিয়াল নম্বর দিয়ে আমাদের নিয়ে আরেকটি রুমে গেল। সেই রুমটি লাশ কাটাঘর থেকে প্রায় ১০০ মিটার দূরে। সেখানে একজন ভদ্র লোকের কাছে ফাইলটি দিয়ে বিস্তারিত জানাল। এরপর এস.আই তার সাথে অফিসিয়াল কিছু কাজ শেষ করে হাসপাতালের আরএমও এর কক্ষে ঢুকলেন। আরএমও আরেকটি লাশ নিয়ে মিটিং করছিলেন। ওই লাশটি নাকি নেত্রকোণা সীমান্তের মধ্যে বিএসএফ-এর গুলিতে মারা গেছে। তাই ওই লাশের পোস্টমর্টেম নিয়ে একটু জটিলতা আছে, সেই বিষয়টি নিয়েই মিটিং চলছিল। ততক্ষণে আমরাও পাশে দাঁড়িয়ে বিস্তারিত শুনছিলাম। যাই হোক, সবশেষে মিটিং শেষ হলো এবং লাশ কাটাঘরে থাকা ছেলেটিকে, যার নাম ছিল দিপু, আরএমও সাহেব একটি ফাইল এগিয়ে দিয়ে বললেন, দিপু, এই ফাইলটা নিয়ে যাও এবং লাশের পোস্টমর্টেমের ব্যবস্থা করো। দিপু বলল, স্যার, এই লাশটা তো একবার পোস্টমর্টেম হয়েছে। দুইবার পোস্টমর্টেম করতে হলে আরও দুজন লোক লাগবে, আর এমনিতেই লাশের অবস্থা ভালো নয়। লাশ পচে গেছে। তখন আরএমও সাহেব বললেন, ঠিক আছে, লাশের সাথে যারা আছে তাদের সহযোগিতা নাও, এই বলে ওই লাশের ঝামেলা শেষ করলেন। আর আমাদের লাশের ফাইলটি এস.আই সাহেব সামনে এগিয়ে দিতেই আরএমও সাহেব যেন তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন। আরএমও সাহেব এস.আই সাহেবকে বলছেন, এইভাবে কে লিখেছে? এস.আই সাহেব বললেন, স্যার, আমি। আরএমও বললেন, কেন এইভাবে লিখছেন? আপনি জানেন না হাতে লেখা কোর্টে জমা দেওয়া যায় না। এই হাতে লেখা কাগজ চলবে না। আপনি পুরো ফাইলটা কম্পিউটার ফরম্যাটে লিখে নিয়ে আসুন, তারপর কাজ হবে। এর আগে হবে না। এই বলে এস.আই সাহেবকে রুম থেকে বের করে দিলেন। সবাই যখন বের হচ্ছিল, আমি বের হইনি। আমি আরএমও সাহেবকে বললাম, স্যার, আপনি কাজটা শুরু করুন, আমি এস.আই সাহেবকে দিয়ে ফাইলটা লিখিয়ে আনছি। আরএমও সাহেব আমাকে বললেন, আপনি আগে লিখিয়ে নিয়ে আসুন, তারপর যা করার করব। তখন আমি আর কিছু বললাম না। রুম থেকে বের হয়ে এস.আই সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম, আপনি জানেন না যে এই হাতে লেখা হবে না?এস.আই সাহেব বললেন, ভাই, আমি গত সপ্তাহেও এইভাবে একটা লাশের পোস্টমর্টেম করিয়ে নিয়ে গেছি। এখন কী হলো বুঝতে পারছি না। তখন আমার যা বোঝার মোটামুটি বুঝে গেছি। আমি এস.আই সাহেবকে বললাম, ভাই, আপনি দ্রুত ফাইলটা লিখুন, আর বাকিটা আমি দেখছি। তারপর আমি আমার ছোট ভাইকে বিস্তারিত বললাম। সে আবার আমার বন্ধুর ছোট ভাইয়ের এক বন্ধুকে বলল, সে আবার নেত্রকোণার এক বড় ভাইকে জানাল। তিনি আমাকে ফোন করে বিস্তারিত জানার পর বললেন, ভাই, তাহলে ফাইলটা লিখে দিন, তারপর আমি কথা বলছি।যাই হোক, আমার যা বোঝার বুঝে গেছি।আমি আমার মামাকে ফোন করে সব বিস্তারিত বললাম। উনি বললেন, আরএমও-এর কাছে যাও, গিয়ে আমার ফোনটা তার কানে ধরে দাও। তখন আমি আরএমও সাহেবের রুমে গিয়ে বললাম, স্যার, আপনার সাথে একজন কথা বলতে চাইছেন, একটু যদি কথা বলতেন। উনি বললেন, দাও। ফোনটা কানে ধরতেই আরএমও সাহেব স্যার, স্যার বলে কথা বলতে থাকলেন। কিছুক্ষণ কথা বলার পর উনি আমাকে বসতে বললেন। আরএমও সাহেব আমাকে বললেন, আমি যার সাথে কথা বলছি তিনি আপনার কে হন? আমি বললাম, আমার মামা। আরএমও সাহেব আমাকে বললেন, আগে বললেই হতো, তাকে বলার কী প্রয়োজন ছিল? আমি তো সমস্যাটা শেষ করে দিতাম। যাই হোক, সবশেষে সব ধরনের ঝামেলার অবসান ঘটিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম কখন আমাদের লাশের পোস্টমর্টেম হবে। তখন বাজে প্রায় বিকাল ৪টা। দীপু এসে বলল, চলুন আমার সাথে। আমি তার সাথে গেলাম, যেখানে লাশ রাখার ফ্রিজার আছে, সেখানে সে তালা খুলে ঢুকল, আমিও তার সাথে ঢুকলাম। ঢুকে দেখি অন্ধকার একটা রুম। লাইট জ্বালানোর সাথে সাথে দেখলাম বিভিন্ন ধরনের প্যাকেটে অনেকগুলো লাশ রাখা আছে। তখন দীপু আমাকে একটা লাশ দেখিয়ে বলল, ভাই, এই লাশটাই আপনার, ধরে রাখুন। লাশটা বের করতে হবে। আমি, দীপু আর আরও দুজন লোক মিলিয়ে মোট চারজনে লাশটা বের করে লাশ কাটার ঘরের দিকে নিয়ে গেলাম। সেখানে একটা উঁচু টেবিলের উপর রেখে বাকিরা চলে গেল। দীপু আমাকে বলল, ভাই, লাশের প্যাকেটটা খুলুন। আমি প্যাকেটটা খোলামাত্র ভয়ংকর একটা দুর্গন্ধ বের হলো। জীবনে এমন ভয়াবহ দুর্গন্ধ আমি কখনও পাইনি। যাই হোক, আমি মুখ ঢেকে কিছুক্ষণ সামলে নিলাম। তারপর দীপু কিছু ধারালো যন্ত্রপাতি নিয়ে এলো। আমি দীপুকে বললাম, ভাই, একটু কম সম কাটুন। দীপু আমার কথা শুনে হাসলো, আর বলল, ভাই, পোস্টমর্টেম তো পোস্টমর্টেমই, কম সম কাটার সিস্টেম নেই। আপনি ধরেন। আমি লাশটাকে ধরলাম, আর দীপু কানের নিচ থেকে কাটা শুরু করে বুকের মাঝখান দিয়ে সোজা নাভির ওপর দিয়ে নিচ পর্যন্ত কাটলো। কেটে লাশের ভিতরের অংশ যাতে দেখা যায়, সেই অবস্থায় রেখে দিল। আমাকে অপেক্ষা করতে বলে দীপু পাশের রুমে চলে গেল। বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষা করার পর RMO সাহেব আসলেন। তিনি লাশটি বেশ কিছুক্ষণ ধরে লাশের বিভিন্ন অংশ দেখলেন এবং ছবি তুললেন। দীপুও বেশ কিছু ছবি তুলে রাখলো। RMO সাহেবের দেখার পর তিনি সেখান থেকে চলে গেলেন। পরে দীপু RMO সাহেবের দেওয়া একটা লিস্ট দেখে লাশের বিভিন্ন অংশের নমুনা রাখলেন। পরে আমিও আগ্রহ বসত লাশের ভিতরের অংশের বিভিন্ন জিনিস খুব ভালো করেই দেখেছি, আর যেহেতু প্রায় ২ থেকে ২.৩০ ঘণ্টা যাবত আমি এই লাশ কাটার ঘরে লাশের সঙ্গে আছি, সেহেতু এখানে ভয় বা আতঙ্কের অনুভূতি, সংকুচ মুটামুটি চলে গেছে। স্যাম্পল নেওয়া শেষ হওয়ার পর লাশের কাটা অংশ সেলাই করা শুরু করলো। আমি এক পাশে ধরলাম, আর দীপু এক পাশ থেকে সেলাই করে আসতে থাকলো। প্রায় ৩০ থেকে ৪০ মিনিট সময় লাগলো লাশটা সেলাই করতে। আরো একটু চালু হতে পারতো যদি লাশটা পুলে না যেত। দীর্ঘ সময় আগে মৃত্ত্যু হয়েছে, তো তাই লাশটা বেশ পুলে গেছে। অবশেষে লাশ সেলাই করা শেষ আমি আর দীপু দুজন মিলে লাশ আগের মতো সেই পুলিশের যে ব্যাগ দিয়ে ছিল, তাতে ঢুকিয়ে জিপার লাগিয়ে ৪ থেকে ৫ গজ পলিথিনের মধ্যে পেঁচিয়ে কিছু নেথপলিশ দিয়ে ভালো করে বেঁধে দিলাম। তারপর দীপুকে ৫ হাজার টাকা দিলাম যদিও দীপু ১১ হাজার দাবি করেছিল। তারপর কিছু ফরম আছে, সেগুলোতে স্বাক্ষর করে আমি লাশ বহনকারী গাড়ির ড্রাইভারকে ফোন দিলাম। ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে আসলো, আমি দীপু, ড্রাইভার এবং একজনে মিলে ৪ জন লাশ গাড়িতে উঠালাম। ততক্ষণে বেজে গেছে সন্ধ্যা ৬টা। নেত্রকোনা থেকে লাশের গন্তব্যস্থান প্রায় ২৫ কিলোমিটার, আসতে আমাদের প্রায় ৪০ মিনিট লাগলো। বাড়িতে পৌঁছে লাশ গাড়ি থেকে নামিয়ে এলাকার একজন মুরুব্বি এবং আমি দুইজন মিলে লাশ ধুয়ার কাজ শেষ করলাম। পরে এলাকার ইমাম সাহেবসহ লাশের কাফন পরিয়ে আমি গুশল করতে গেলাম। গুশল সেরে লাশ নিয়ে পাশের এক মাদ্রাসার মাঠে জানাজার নামাজ শেষে পারিবারিক কবরস্থানে লাশ দাফন শেষ করলাম। ততক্ষণে ঘড়ির কাটা রাত ১১টা পার হয়েছে।
বাশার
জীবন থেকে নেয়া।
১০/২৯/২০২৪