26/07/2026
বাংলা সংগীতের প্রবাদপুরুষ: সুরসম্রাট কমল দাশগুপ্ত। জন্ম ও পৈত্রিক পরিচয়: কিংবদন্তি এই সংগীত ব্যক্তিত্ব ১৯১২ সালের ২৮ জুলাই তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের কুচবিহারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা তারাপ্রসন্ন দাশগুপ্ত ছিলেন একজন উচ্চাঙ্গসংগীত অনুরাগী ও সফল ব্যবসায়ী। কুচবিহারে জন্ম হলেও তাঁর পৈত্রিক নিবাস ছিল তৎকালীন যশোর জেলার (বর্তমান নড়াইল জেলা) কালিয়া উপজেলার বেন্দা গ্রামে। তাঁর পুরো নাম ছিল কমলপ্রসন্ন দাশগুপ্ত, তবে তিনি 'কমল দাশগুপ্ত' নামেই সমধিক পরিচিতি লাভ করেন।শিক্ষাজীবন ও সংগীতে হাতেখড়িকমল দাশগুপ্তের শিক্ষাজীবন শুরু হয় কলকাতায়। ১৯২৮ সালে তিনি ক্যালকাটা একাডেমী থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিক পাস করেন এবং পরবর্তীতে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বি.কম ডিগ্রি লাভ করেন।ব্যবসায়িক শিক্ষার ছাত্র হলেও সুরের প্রতি তাঁর আকর্ষণ ছিল জন্মগত। তাঁর সংগীতে প্রথম হাতেখড়ি হয় তাঁর বড় ভাই বিমল দাশগুপ্তের কাছে পরবর্তীতে তিনি বিখ্যাত সংগীতজ্ঞ দিলীপকুমার রায়, কৃষ্ণচন্দ্র দে (কানা কেষ্ট) এবং ঠুমরি সম্রাট ওস্তাদ জমিরুদ্দিন খাঁর অধীনে শাস্ত্রীয় সংগীতের উচ্চতর তালিম নেন। মীরার ভজনে সুরের প্রয়োগ ও গবেষণা করে ১৯৪৩ সালে তিনি বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সংগীতে ডক্টরেট (Doctorate in Music) ডিগ্রি লাভ করেন।সংগীতের মহাবিস্ময় ও সৃষ্টিশীলতা১৯৩৫ সালে কমল দাশগুপ্ত ভারতের বিখ্যাত গ্রামোফোন কোম্পানি এইচএমভি (HMV)-তে সংগীত পরিচালক হিসেবে যোগ দেন। তাঁর সুরারোপিত প্রথম গান "আমি সাঁঝের তারকা আমি", যা গেয়েছিলেন প্রণব রায়ের কথায় যুথিকা রায়। গানটি প্রকাশের পর রাতারাতি বিপুল लोकप्रियता পায়।বিপুল সৃষ্টি: তিনি তাঁর কর্মজীবনে প্রায় ৮,০০০ (আট হাজার) গানে সুরারোপ করেছিলেন। তাঁর সুর সৃষ্টির গতি ছিল বিস্ময়কর—তিনি প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৪৫টি গানের সুর তৈরি করতেন। ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তাঁর অসাধারণ সুরের সংখ্যা ৭ হাজার ছাড়িয়ে যাওয়ায় এইচএমভি কোম্পানি তাঁর সুর সৃষ্টির ‘রজত জয়ন্তী’ (Silver Jubilee) পালন করে।চলচ্চিত্রে অবদান: তিনি প্রায় ৮০টি বাংলা চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালনা করেন। এর মধ্যে 'তুফান মেল', 'ঝামেলার প্রেম', 'এই কি গো শেষ দান', এবং ১৯৬৭ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত 'বধূ বরণ' উল্লেখযোগ্য। বাংলা ছাড়াও তিনি হিন্দি, উর্দু, তামিল এবং এমনকি একটি আমেরিকান চলচ্চিত্র ‘War Propaganda’-র আবহ সংগীত পরিচালনা করেন।স্বরলিপির নতুন পদ্ধতি: সংগীতে তাঁর একটি বড় আবিষ্কার হলো স্বরলিপি লেখার নিজস্ব একটি সংক্ষিপ্ত পদ্ধতি বা শর্টহ্যান্ড মেথড (Shorthand method for Swaralipi) উদ্ভাবন করা।নজরুল সংগীত ও ঐতিহাসিক কিছু সৃষ্টিকাজী নজরুল ইসলামের সাথে কমল দাশগুপ্তের ছিল অত্যন্ত নিবিড় সম্পর্ক। কবির অসুস্থতার পর তাঁর গানগুলোর বিশুদ্ধ সুর সংরক্ষণে কমল দাশগুপ্ত প্রধান ভূমিকা পালন করেন। এছাড়া ভারতীয় উপমহাদেশের বেশ কিছু ঐতিহাসিক গানের সুরকারও ছিলেন তিনি:১. রণসংগীত: নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর আজাদ হিন্দ ফৌজের বিখ্যাত রণসংগীত ‘কদম কদম বাড়ায়ে যা’-র সুরকার ছিলেন কমল দাশগুপ্ত।২. হায়দ্রাবাদের নিজামের গান: হায়দ্রাবাদের নিজামের গোল্ডেন জুবিলী উৎসবের বিশেষ গানটির সুর করার জন্য তাঁকেই আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল।৩. ভাষা আন্দোলনের গান: ঢাকায় অবস্থানকালে তিনি আবদুল গাফফার চৌধুরী রচিত অমর একুশের গান ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’-র প্রথম স্বরলিপি বা সুরবিন্যাস করেছিলেন।ব্যক্তিগত জীবন ও উত্তরসূরিদের সংগীত ধারা১৯৫৬ সালে কমল দাশগুপ্ত ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং তাঁর নতুন নাম রাখা হয় কামাল উদ্দিন আহমেদ। একই বছর তিনি তাঁর প্রিয় ছাত্রী এবং নজরুলের গানের প্রখ্যাত কণ্ঠশিল্পী ফিরোজা বেগম-এর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। এই দম্পতির তিন পুত্র সন্তান—তাহসিন আহমেদ, হামিন আহমেদ এবং শাফিন আহমেদ।পিতা ও পুত্রের মিউজিক্যাল মেলবন্ধন এবং ফিউশন (বিশ্লেষণ)পারিবারিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় কমল দাশগুপ্তের কনিষ্ঠ পুত্র শাফিন আহমেদ (১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৬১ – ২৪ জুলাই ২০২৪) হয়ে ওঠেন আধুনিক বাংলা ব্যান্ড সংগীতের অন্যতম পথিকৃৎ এবং প্রবাদপ্রতিম রক স্টার। আপাতদৃষ্টিতে পিতার শাস্ত্রীয় ও নজরুল সংগীতের ধারার সাথে শাফিনের 'রক ও ফিউশন' ঘরানার ভিন্নতা চোখে পড়লেও, তাঁদের অবদানের গভীরে এক অপূর্ব মিউজিক্যাল মেলবন্ধন ছিল:জেনেটিক সুরের জাদুকর: কমল দাশগুপ্ত যেভাবে রাগা ও ঠুমরিভিত্তিক ক্লাসিকাল সুরকে সাধারণ মানুষের বোধগম্য মেলোডিতে রূপান্তর করতেন, শাফিন আহমেদও ঠিক একইভাবে পশ্চিমা রক, ব্লুজ ও জ্যাজ মিউজিককে প্রাচ্যের মেলোডির সাথে ফিউশন করেন। শাফিনের গায়াকিতে যে ব্লুজি বা মেলোডিক টান ছিল, তা মূলত পিতার শাস্ত্রীয় সুরের নিখুঁত দীক্ষারই আধুনিক সংস্করণ।মাইলস (Miles) ও সুরের আধুনিকায়ন: বড় ভাই হামিন আহমেদকে সাথে নিয়ে শাফিন আহমেদ বাংলাদেশের কিংবদন্তি রক ব্যান্ড 'মাইলস'-এর মাধ্যমে বাংলা গানের নতুন বিপ্লব ঘটান। শাফিনের কণ্ঠে ও সুরে 'ফিরিয়ে দাও', 'কী জাদু', 'আজ জন্মদিন তোমার' বা 'চাঁদ তারা সূর্য'-র মতো গানগুলোতে যে শক্তিশালী 'গ্রুভভিত্তিক বেজ লাইন' ও 'সুরকাঠামো' দেখা যায়, তা প্রকারান্তরে কমল দাশগুপ্তের সেই সৃষ্টিশীল দূরদর্শিতারই আধুনিক রূপ।পিতার প্রতি উত্তরসূরির শ্রদ্ধা: শাফিন আহমেদ সবসময়ই সচেতনভাবে তাঁর বাবার ঐতিহাসিক কাজ ও সুরের উত্তরাধিকার বয়ে বেড়াতেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মঞ্চে এবং টেলিভিশন অনুষ্ঠানে (যেমন বিটিভির 'এই কি গো শেষ দান' অনুষ্ঠান) শাফিন আহমেদ তাঁর বাবার সুর করা কালজয়ী গানগুলো রি-মেক করে নতুন প্রজন্মের কাছে পরিবেশন করতেন। তিনি মনে করতেন, তাঁর সুরের নিখুঁত পরিমাপ ও সংগীতে নিরীক্ষা করার সাহসটি সরাসরি পিতা কমল দাশগুপ্তের থেকে পাওয়া।শেষ জীবন ও মহাপ্রয়াণ১৯৬৭ সালে কমল দাশগুপ্ত সপরিবারে স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন। ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন। জীবনের শেষ বছরগুলো তিনি অত্যন্ত সাধারণ ও নিভৃতে কাটিয়েছেন। ১৯৭৪ সালের ২০ জুলাই ঢাকার তৎকালীন পিজি হাসপাতালে (বর্তমান বিএসএমএমইউ) সুরের এই মহান জাদুকর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
সূত্র: ইউকিপিডিয়া।