25/09/2020
উত্তর এবং দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানের ওপর অভাবনীয় নিয়ন্ত্রণ এসে পড়েছিল। আল-কায়েদা গোপনে গোপনে এখানে নিজেদেরকে নতুন করে সংগঠিত করে নিয়েছে। এবং এর ফায়দা আফগান তালেবান পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে। যাতে তারা ন্যাটোর কার্যপরিধি ও অপারেশন এরিয়া সংকীর্ণ করে দিতে পারে। যারা আফগানিস্তানকে এক সহজ শিকার ভেবেছিল।
এটা সেই পথের প্রথম মাইলফলক ছিল, যা আল-কায়েদা নিজেদের লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য অতিক্রম করেছিল। আল-কায়েদা এই অবস্থা ২০০২ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত দীর্ঘ তিন বছর সময়ব্যাপী সৃষ্টি করেছিল, যাতে ২০০৬ সালের মধ্যে তালেবান আফগানের ভিতর একটি প্রভাবশালী প্রত্যাবর্তন ও পুনর্জাগরণ তৈরির যোগ্য হতে পারে। এই প্রত্যাবর্তন ২০০৬ সালে তালেবানের ‘বসন্তকালীন আক্রমণ’ নামক এক প্রকম্পিত ও ঝড়ো উত্থানের গল্প শোনায়; যেখানে বেশ কিছু নতুন চরিত্রের আবির্ভাব ঘটে। তালেবান পুরো তাক লাগিয়ে দিয়েছিল তাদেরকে, যারা এই ধারণা করে বসেছিল যে - তালেবান তো এক অতীত ইতিহাস মাত্র!
২০০৬ সালে সবকিছুই ছিল আল-কায়েদার হাতে, কিন্তু তারা নিজেরা ছিল পর্দার অন্তরালে। যেন ‘আল-কায়েদা’ সুতোয় তৈরি এক চাদর ছিল ‘তালেবান’। আল-কায়েদার তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য ছিল, আফগানে তালেবানের জাঁকজমকপূর্ণ অভ্যুত্থান। আর এই উদ্দেশ্য হাসিল হওয়ার পর নতুন ভবিষ্যৎ কর্মকৌশল সামনে আনার প্রয়োজন দেখা দিল।
২০০৫-এর পুরো সময়টা পাকিস্তানের গোত্রীয় এলাকাগুলোতে তালেবানের নতুন অবকাঠামো তৈরি এবং ইরাকি প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সঙ্গে সম্পর্ক কায়েম করার সাথে সাথে, দক্ষিণ-পশ্চিম আফগানিস্তানে তালেবান ও আল-কায়েদার নেতৃত্বে আসন্ন বসন্তকালীন আক্রমণের প্রস্তুতিতে অতিবাহিত হয়েছে।
এই প্রস্তুতির মধ্যে একটি ছিল ইরাকি দলসমূহের নেতৃস্থানীয়, অভিজ্ঞ, পোড়খাওয়া যোদ্ধাদের বিভিন্ন গ্রুপের সাথে স্থানীয় যোদ্ধাদের হাই-ফ্রিকোয়েন্সি ট্রেনিং ক্যাম্পগুলোর পারস্পরিক যোগসূত্র। ইরাকি এবং পাকিস্তানি যোদ্ধারা মিলে এই কৌশলগত কর্মপদ্ধতি স্থির করেছিল, যা পরবর্তীতে তালেবান যোদ্ধারা ওয়াজিরিস্তানের ক্ষেত্রে ব্যবহার করবে। এই যুদ্ধকৌশল বিক্ষিপ্ত ও ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অস্ত্রবাজ পশতুন গোত্র ও আদর্শবাদী সৈনিকদের মাঝে বিস্তৃত পরিসরে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে আরব, উজবেক, চেচেন ও আফগান লড়াকু সৈনিকেরা কান্দহারের পতনের পর (অর্থাৎ, ৯/১১ পরবর্তী আমেরিকান হামলার শুরুর দিকে), নতুন করে ছোট ছোট বিভিন্ন অস্থায়ী ক্যাম্পে ঐক্যবদ্ধ ও সুসংগঠিত হয়ে গিয়েছিল। আর এই ক্যাম্পগুলো ছিল উত্তর এবং দক্ষিণ ওজিরিস্তানের একদম প্রাণকেন্দ্রে।
আফগানিদেরকে কারজাই সরকার ও পশ্চিমা জোটগুলোর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক প্রতিরোধ যুদ্ধে নামানোর পরিবর্তে দক্ষিণ-পশ্চিম আফগানিস্তানে তালেবান গ্রুপগুলোকে সুসংগঠিত করা ছিল আসলেই এক বুদ্ধিদীপ্ত কৌশল। আর এর ফলাফল ছিল ২০০৬ সালের বসন্তকালীন হামলার সফল আত্মপ্রকাশ। যদিও সর্বপ্রথম সেই দুষ্ট দলটিকে খুঁজে বের করার প্রয়োজন ছিল, যারা বারংবার তালেবানের বিভিন্ন গ্রুপের মাঝে কলহ সৃষ্টি করার পাঁয়তারা করে চলছিল।
এই দুই গোত্রীয় এলাকার (উত্তর ও দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তান) সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী দুটো দলকে নতুনভাবে বিন্যাস্তকরণ ও ঐক্যবদ্ধকরণ ছিল আল-কায়েদা, মোল্লা উমার ও তালেবানের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের প্রধান লক্ষ্য। ফলাফল হিসেবে তারা চাইছিলেন - এই কেন্দ্র থেকে দক্ষিণ-পশ্চিম আফগানিস্তানের শক্তিশালী আমেরিকান যুদ্ধযন্ত্রের ওপর জানবাজ হামলা করা এবং পশ্চিমা মিডিয়া প্রভাবিত আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে দক্ষিণ আফগানিস্তান ও পার্শ্ববর্তী গোত্রীয় এলাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার ঘোষণা করা; যার দ্বারা তালেবানের সফল প্রত্যাবর্তন এবং আল-কায়েদার কেন্দ্রীয় আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হওয়াটা সহজতর হবে। তবে ব্যাপক হৈচৈ পড়ে যাওয়া এবং প্রসিদ্ধি পাওয়া সত্ত্বেও ২০০৬ সালের প্রত্যাবর্তন প্রথমদিকে আসলে সাধারণ একটি অপারেশন ছাড়া আর তেমন কিছু ছিল না। সাধারণের মাঝে এমনটাই গেঁথে গিয়েছিল যে - তালেবানের ২০০৬ সালের আক্রমণ অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়বে, তাদের চলমান হামলা গরমের মৌসুম শেষ হওয়ার আগেই শেষ হয়ে যাবে, আর মুজাহিদদের প্রতিষ্ঠাতা আল-কায়েদা ও তালেবান খুব শীঘ্রই বিস্মৃতির অন্তরালে হারিয়ে যাবে।
এইসব কিছুর শুরু ছিল ২০০৬ সালের মে মাসের শেষের দিকে, যখন তালেবান সেন্ট্রাল কমান্ডের পক্ষ থেকে বাহ্যিকভাবে দেখতে অগুরুত্বপূর্ণ একজন দূতের ওয়াজিরিস্তান সফর করলেন। এই দূত ছিলেন কূটনৈতিক দূরদর্শিতায় প্রসিদ্ধ, এক পা ওয়ালা একজন ফৌজি কমান্ডার৷ এই অঞ্চলে (ওয়াজিরিস্তানে) তাঁর আবির্ভাব যেন তালেবানের ভাগ্য পরিবর্তনের অসিলা ছিল৷ তিনি আর কেউ নন, মোল্লা দাদুল্লাহ। দক্ষিণ-পশ্চিমের গোত্রীয় এলাকাগুলোর সেনা কমান্ডারদের মাঝে এখনও তাঁর নাম অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয়৷
বই : আরব্য রজনীর নতুন অধ্যায়
লেখক : সাইয়্যেদ সেলিম শেহজাদ
নির্ধারিত মূল্য ৩৪০ টাকা