20/10/2023
আমাদের সন্তানকে কাজ শেখাতে হবে।
আপনাদের সঙ্গে আমি আজকে কিছু অপ্রিয় সত্য কথা শেয়ার করব। তার আগে বলে নিচ্ছি আমি লিখি কোনো একটা বাস্তব ঘটনাকে কেন্দ্র করে সেটা থেকে যেন আপনারা ভালো-মন্দ, ভুল-ঠিক বুঝে নিজেদের বেলায় প্রয়োগ করতে পারেন।
কথাটা হলো, আমাদের কমিউনিটি বা সাউথ এশিয়ান অনেক ছেলেমেয়েরা কিন্তু কোনো একটা কর্মক্ষেত্রে গিয়ে তেমন একটিভ পারফরমেন্স দেখাতে পারছে না। এতে করে employer রা কিন্তু খুশি হতে পারছেন না। পক্ষান্তরে সাদা কানাডিয়ানরা নিজেকে নিংড়ে দিয়ে কাজের মাত্রা দেখিয়ে দিচ্ছে। আচ্ছা ঠিক আছে, এখন একটা বাস্তব উদাহরণ দিই। এক কানাডিয়ান কর্মস্থলে সাউথ এশিয়ান ছেলে CO-OP করতে আসে। এদেশে গ্রেড নাইন-টুয়েলভের স্টুডেন্টরা বিভিন্ন কর্মস্থলে co-op কাজ করতে যায়। co-op করার সময় যেসব স্টুডেন্টরা ভালো পারফরমেন্স করে তাদের কিন্তু একই জায়গায় পার্মানেন্ট কাজ হয়ে যায় অনেক সময়। কিন্তু সাউথ এশিয়ান যেসব ছেলেরা ঐ কর্মস্থলে co-op করতে এসেছিল তারা কাজের পারফরমেন্স ভালো করতে পারে নি। এখানে ভালো বলতে যেটা বোঝাচ্ছি ইনিশিয়েটিভ নেওয়া। মানে ধরুন, কাজের জায়গায় নিজের থেকে পটাপট সব কাজ করে ফেলতে হবে। ঘুরে বেড়ানো বা বস একটা কাজ করতে না বলা পর্যন্ত না করা এটাকে বলে lack of initiative. তো যে কর্মক্ষেত্রের কথা বলছি সেখানকার ম্যানেজার ঐসব ছেলেদের ওপর মোটেও খুশি হতে পারেন নি। সো ম্যানেজার মনে করছেন সাউথ এশিয়ান মানেই মনে হয় lack of initiative. আবার ঐ একই কর্মক্ষেত্রে আরেকজন আফ্রিকান ছেলে পার্মানেন্ট পজেশনে কাজ করত। তারও কোনো ইনিশিয়েটিভনেস ছিল না। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকত। ম্যানেজার বলার পর তখন কাজটা করত ইত্যাদি। একদিন ম্যানেজার সিদ্ধান্ত নেন ঐ আফ্রিকান ছেলেকে তিনি আর রাখবেন না। মানে ফায়ার করে দেবেন। ম্যানেজার তাকে warning দিয়েছিলেন তিনবার। কাজ হয় নি। যেই কথা, সেই কাজ। ম্যানেজার সব প্রমাণ-দলিল সঞ্চয় করে রাখলেন ঐ ছেলেটার বিরুদ্ধে। তারপর একদিন কাজ শেষে ছেলেটার হাতে ধরিয়ে দিলেন ফায়ারের লেটার। ব্যাস। শেষ। এই হলো দুইটা উদাহরণ। এখন ঐ একই প্রতিষ্ঠানের আরো দুইটা উদাহরণ দিচ্ছি শোনেন। একটা সাদা কানাডিয়ান ছেলে সে টুয়েলভ গ্রেড পাশ করে কলেজে একটা বিষয়ে ডিপ্লোমা করছে। সে ঐ প্রতিষ্ঠানে প্রথমে co-op এর জন্য এসেছিল। পরে তার কাজের দক্ষতা দেখে ম্যানেজার তাকে হায়ার করে নেন। সেই ছেলেটা পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরিও করছে। সে প্রতিষ্ঠানের যে কোনো কাজ করে, ওভার টাইম কাজ করতে বললে করে, মোট কথা এই টিনেজার ছেলেটা বিদ্যুতের মতো ছুটে চলে। কথার কথা কুকুর পায়খানা করে চলে গেছে কেউ সেটা পরিস্কার করবে না কিন্তু ঐ ছেলে ছুটে গিয়ে পরিস্কার করছে। এক পর্যায়ে পুরো প্রতিষ্ঠান তার ওপর প্রচণ্ডভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। সবাই তার সঙ্গে কাজ করতে চায়। এদিকে ঐ ছেলে ম্যানেজারকে বলেছে তার বেতন না বাড়ালে সে চাকরি ছেড়ে দেবে। ম্যানেজার পড়লেন ফাপড়ে। ঐ ছেলেকে বেতন না বাড়িয়ে কোনো উপায় নেই। কারণ ম্যানেজারও জানেন এই ছেলে কাজের। কোনো কিছু বলে দিতে হয় না করার জন্য। অবশেষে ম্যানেজার তার বেতন বাড়িয়ে দিলেন। একদিকে ইনিশিয়েটিভ না নেওয়ার জন্য আফ্রিকান ছেলেকে ফায়ার করলেন, এশিয়ান ছেলেদের ওপর খুশি না অন্য দিকে এই টিনেজারকে বেতন বাড়িয়ে ধরে রাখলেন। এখন তো আপনারা বলবেন, সাদা ম্যানেজার সাদা ইমপ্লয়ির পছন্দ করেছে। জি না। এমন ধারণা শুধু আমরা বাঙালিরাই করতে পারি। ঐ প্রতিষ্ঠানে সব দেশের মানুষ আছে। কাজের ওপর ভিত্তি করে প্রত্যেকের মূল্যায়ন করা হয়। তার অনেক প্রমাণ আছে।
আর এই টিনেজার ছেলের পারিবারিক ব্যাকগ্রাউন্ড অনেক হাই। মা হাইস্কুলের টিচার। বাবাও অনেক ভালো কিছু। তাদের রয়েছে দামি বাড়ি, cottage. প্রত্যেকেই চালায় একটা করে ব্রান্ডের গাড়ি। সেই ছেলে কুকুরের পায়খানাও পরিস্কার করতে দ্বিধা করে না।
এদিকে এক বাঙালি ভাই ঐ প্রতিষ্ঠানে একটা কাজ করতে এলেন। তিনি ঐ সাদা ছেলেটার কাজ দেখে অবাক হয়ে গেলেন। তিনি বললেন, "আমারও তো ছেলে আছে। তার মা তাকে এক গ্লাস পানি ঢেলে পর্যন্ত পান করতে দিতে চান না। অথচ এই সাহেবের বাচ্চার মতো চেহারা-সুরতের ছেলে কীভাবে কাজ করছে যা আমাকে তাজ্জব করেছে।"
আরেকদিন আমি আরেকজন বাঙালি ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলছিলাম। উনার মেয়ে এখানকার ইন্টারন্যাশনাল স্টুডেন্ট। আমি জানতে চাইলাম, আপনার মেয়ে কি পার্ট টাইম কাজ করে? উনি বললেন, না গো আপা, কি যে বলেন। ও কাজ করবে কেমনে। আমার দুই ছেলেমেয়েকে ওদের মা নরম বিছানায় শুইয়ে বড়ো করেছে। আমি টাকা দিই মেয়ে পড়ে।"
এখন আমার কথা বলি, আমার সব ছেলেমেয়ের কাজ ভাগ করে দিয়েছি। ছেলে ময়লা ফেলবে, ঘর ঝাড়ু দেবে, বাবার গাছ কাটায়-ঘাস কাটায় সাহায্য করবে ইত্যাদি। বড়ো মেয়ে লন্ড্রি করবে, ড্রায়ারে দেবে, বের করবে, ভাঁজ করবে ইত্যাদি। মেজ মেয়ে তো আলহামদুলিল্লাহ প্রায় সব কাজই করে। প্রত্যেকেই খাওয়ার পর নিজের প্লেট ধুয়ে রাখবে। গোসলের পর বাথটাব পরিস্কার করবে ইত্যাদি। মাঝে মাঝে বড়ো দুটো যখন করতে চায় না আর মেজ মেয়ে অনেক করে তখন আমি বলি, আমার যা কিছু আছে জুয়েলারি, বাড়ি-গাড়ি, জামা-কাপড় আরো অনেক কিছু সব কিছু তুই নিবি। এ কথা শুনে ছোট্ট মেয়েটা ঝাড়ু নিয়ে ঘর পরিস্কার করে এসে বলে, “How about me? I cleaned a lot.” আমি বলি ঠিক আছে তোকেও অল্প কিছু দিবোনে।
আপনারা যারা সন্তানদের বিদেশে পাঠাতে চান তারা অবশ্যই তাদের কাজ করতে দেন। বিদেশ না আসলেও সমস্যা নেই। দেশেও কাজ করার দরকার আছে।
আল্লাহ আপনাদের সুস্থ রাখুন।
কাজী হালিমা আফরীন
টরন্টো, কানাডা।
(তাড়াতাড়ি লেখার কারণে ও পরে না চেক করার কারণে আমার অসংখ্য বানান বা বাক্য গঠন ভুল হয় প্রায় প্রতিটা ভিডিয়ো বা পোস্টে। সেইজন্য আমি দুঃখিত। পরে সেগুলো দেখে বুঝতে পারি। কিন্তু ভিডিয়োর মধ্যে ঠিক করা যায় না। আপনারা সঠিকটা পড়ে নেন বলে অসংখ্য ধন্যবাদ জানাচ্ছি।)
ফটোগ্রাফি বাই মি।