29/10/2017
Rangamati
হৃদ পাহাড়ের রাঙামাটি
চট্টগ্রাম, দেশের পথে
আমাদের দেশে ভ্রমণকারীগন স্বাধারন শীতে বেড়াতেই বেশী পছন্দ করেন। অবশ্য এর পক্ষে যথেষ্ট যুক্তিও রয়েছে। আপনি ও যদি তেমনই একজন ভ্রমনকারী হয়ে থাকনে,তাহলে নিশ্চয়ই এবারের শীতে কোথাও বেড়াতে যাবার কথা ভাবছেন ? কোথায় যাবেন …..? সাগর না পাহাড় ? নাকি অরণ্যভূমি সুন্দরবন ? যদি পাহাড়কে বেছে নেন, তাহলে নিশ্চিন্তে নির্ভাবনায় চলুন রাঙামাটি। কান পেতে শুনুন- হৃদ পাহাড়ের শহর আপনাকে হাতছানি দিয়ে ডাকছে।
কেন যাবেন রাঙামাটি
এ বাংলার এমন কোন শহর কি আছে, যেখানে ৩৫৬ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিশাল হ্রদ ঘিরে রেখেছে সবুজ শহরকে ? সুবিশাল সবুজ বিষণ্ন পাহাড় রূপের পসরা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ? পাহাড়ের কান্না হয়ে আর কোথাও কি এমন অসংখ্য ঝর্ণা ঝড়ে পড়ছে সকাল-দুপুর-সাঁঝে? প্রমত্তা নদীর বুকে বাঁধ দিয়ে কোথায় তৈরি হয় বিদ্রুৎ ? জীব বৈচিত্র্যের অন্যতম আঁধার কোন জায়গাটি ? বিশালাকার হাতির পাল দলবেঁধে কোথায় নির্ভাবনায় হেঁটে বেড়ায় ? ১৩ টি জনগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় জীবনাচার কোথায় মুগ্ধতা ছড়ায় পথে প্রান্তরে ?
অবশ্যই রাঙামাটিতে…… !
সুতরাং জীবনের স্বাদ, অপূর্ণতা আর বিশালতাকে উপভোগ করতে পার্বত্য রাঙামাটিই হতে পারে এবারের শীতে আপনার ভ্রমনতীর্থ।
কিভাবে যাবেন ?
স্থল অথবা আকাশ-যে কোন পথেই খুব সহজেই যেতে পারেন রাঙ্গামাটি। ট্রেনে যেতে চাইলে রাজধানী ঢাকার কমলাপুর থেকে আর বিমানে যেতে চাইলে শাহজালাল ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে চেপে বসুন যেকোন ট্রেনে বা বিমানে, চট্টগ্রাম নেমেই অটোরিক্সায় চলে যান বিআরটিসি কাউন্টার কিংবা অক্সিজেনের রাঙামাটি কাউন্টারে। বাসে ১১০ টাকায় পাহাড়ীকা পরিবহন আর ৯০ টাকায় বিরতিহীন পরিবহনে মাত্র আড়াই ঘন্টায়ই পৌঁছে যাবেন পাহাড়ি শহর রাঙামাটি। পাহাড়ীকা বা বিরতিহীন সকাল ছ’টা থেকে টাকা রাত ৮ টা অব্দি ৪০ মিনিট বিরতিতে ছেড়ে যায় রাঙামাটির উদ্দেশ্যে। তাছাড়া গাবতলী,ফকিরাপুলসহ ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে সরাসরি রাঙ্গামাটি যাবার এসি/নন এসি বাস রয়েছে।
কোথায় থাকবেন ?
পর্যটন মৌসুমে রাঙামাটি যেতে চাইলে,আগে থেকে বুকিং না করে যাবার মতো বোকামি করবেন না। বছরের অন্যান্য সময় ততটা চাপ থাকেনা। শহরজুড়েই রয়েছে বাণিজ্যিক হোটেল মোটেল। প্রবেশ পথের মোটেল জর্জ থেকে শহরের শেষপ্রান্তর পর্যটন মোটেল, যেখানেই উঠেন, ভাড়া রুমের আকার ও সুবিধাভেদে মাত্র ৩০০ থেকে ২৫০০ টাকা। যারা একটু নিরাপদে আর স্বাচন্দ্যে থাকতে চান তাদের জন্য বাণিজ্যিক হোটেল নিডস হিলভিউ, মোটেল জর্জ, সাংহাই ইন্টারন্যাশনাল, হোটেল মেহেদী, হিলপ্যালেস, গ্রীন ক্যাসেল,হোটেল সুফিয়া’ই ভালো। আর কম খরচের হোটেলে থাকতে চাইলে সরাসরি চলে যান রিজার্ভবাজার। সেখানে ৫০-৩০০ টাকায় মোটামুটি মানের অনেকগুলো হোটেলই আছে। আর সরকারি ডাকবাংলোগুলোর মধ্যে সার্কিট হাউস, জেলা পরিষদ রেস্ট হাউস,ফরেস্ট রেস্ট হাউজ,পিডিবি রেস্ট হাউজ,কৃষি বিভাগের রেস্টহাউজ,বিসিক রেস্টহাউজসহ প্রায় সবগুলো সরকারি অফিসেরই রয়েছে নিজস্ব রেস্ট হাউজ। সম্পর্ক এবং সুবিধাভেদে আপনিও হয়ে যেতে পারেন এইসব গেস্ট হাউজের অতিথি। যেহেতু সরকারি,ভাড়াও তাই আপনার আওতার মধ্যেই থাকবে। শহর ছাড়িয়ে দূরে কোথায় থাকতে চাইলে সোজা চলে যান কাপ্তাইয়ের নয়নাভিরাম সেনাবাহিনীর জীবতলি রিসোর্ট কিংবা নৌবাহিনীর নেভাল রিসোর্টে। হ্রদের পাড়ে রাত্রির নির্জনতা আপনাকে ছুঁয়ে যাবে নিশ্চিত। থাকতে পারেন শহরের প্রাণকেন্দ্রে সেনাবাহিনীর রেস্টহাউজেও। কিন্তু মনে রাখবেন,সেনাবাহিনীর কোন রিসোর্ট বা গেষ্ট হাউসে থাকতে হলে আপনার অবশ্যই কোন পরিচিত সেনা অফিসারের রেফারেন্স লাগবে,একটু নির্জনতা আর ভালোলাগার জন্য না হয়,কষ্ট করে রেফারেন্স জোগাড় করেই নিলেন ।
ট্যুর প্ল্যান
সকালে রাঙ্গামাটি পৌছে ঘণ্টা দুয়েক রেস্ট নিয়ে টুরিস্ট বোট রিজার্ভ করে চলে যান শুভলং ঝর্ণায়। যাওয়া-আসা-সেখানে কিছু সময় অবস্থান,পথে পাহাড়ের বুকে রেস্টুরেন্টে ঐতিহ্যমন্ডিত খাবার,সব মিলিয়ে একটা দিন কেটে যাবে আপনার। দেখা হয়ে যাবে পেদাটিংটিং,জুমঘর,টুকটুক ইকো ভিলেজ, চাংপাং পর্যটন স্পট আর চাইলে সুভলং বাজারও। হ্রদে জেলে নৌকার প্রানবন্ত উপস্থিতি,জলমগ্ন ভাসমান জীবন আপনাকে আকৃষ্ঠ করবে। যাত্রা বা ফেরার পথে দেখে নিবেন রাঙামাটি পর্যটন মোটেল সংলগ্ন সেই বিখ্যাত ঝুলন্ত সেতুটি। বিকেলে হোটেল ফিরে বিশ্রাম নিয়ে সন্ধ্যায় চলে যান স্থানীয় আদিবাসী পোশাক মার্কেটে। কিনতে পারেন প্রিয়জনের জন্য স্থানীয় পোষাক। দামাদামি খুব একটা যুত্সই হবেনা, কারণ প্রায় সব দোকানেই ফিক্সড প্রাইস ট্যাগ ঝোলানো ! পরদিন ভোরে রিজার্ভ অটোরিক্সা কিংবা মাইক্রো বাসে চলে যান কাপ্তাই। এশিয়ার বৃহত্তম কাগজ কল,দেশের একমাত্র জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, নেভি ক্যাম্প,কাপ্তাই জাতীয় উদ্যানসহ অসংখ্য দর্শনীয় স্থান আছে এখানে। তবে সবচে ভালো লাগবে যাওয়া আসার ১৯ কিলোমিটার পথটিই।এপথেই দেখে নিতে পারেন বৌদ্ধধর্মীয় গুরু বনভন্তের জন্মস্থান মোরঘোনা।অনুমতি সাপেক্ষে বিদ্যুৎ উত্পাদন প্রক্রিয়া দেখার পাশাপাশি দাঁড়িয়ে উপলদ্ধি করতে পারবেন,আজ থেকে ৫৪ বছর আগে কিভাবে প্রমত্তা খোরস্রোতা নদী কর্ণফুলিতে বাধ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশাল বাঁধ। বাঁধের একপাশে নদী আর অন্যপাশে হ্রদ। কাপ্তাই ভ্রমন শেষে সন্ধ্যা নামার আগেই ফিরে আসুন রাঙামাটি। পরদিন সকাল বেলা রাঙামাটি রাজবন বিহারে চলে যান,দেখুন বৌদ্ধ সন্যাসীরা কিভাবে আত্মমগ্ন হয়ে নির্জনে ধর্মচারে ব্রত। এখানে দেখতে পাবেন প্রয়াত বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু বনভন্তের প্রক্রিয়াজাত করে রাখা দেহ। এখান থেকে বেরিয়ে চলে যান সুখীনীলগজ্ঞ। না,নাটকের সেই সুখীনীলগজ্ঞ নয়। রাঙামাটির এক খেয়ালি পুলিশ সুপারের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত নতুন পুলিশ লাইন। দেশের আর দশটি পুলিশ লাইনের চেয়ে একেবারেই আলাদা এটি। এখানে আছে বিচিত্র ধরণের গাছের সমাহার। পাশেই রাঙামাটি জেলা পরিষদের বোটানিক্যাল গার্ডেন। সেখানটাও ঘুরে দেখতে পারেন।এখান থেকে চলে যান ডিসি বাংলো। অনুমতি সাপেক্ষে ঘুরে দেখুন জেলার সবচে প্রাচীন ও অভিজাত বাড়ীটি এবং সংলগ্ন জাদুঘর।
রসনায় ভিন্ন কিছু
রাঙামাটি বেড়াতে আসবেন আর স্থানীয়দের ঐতিহ্যবাহি রীতিতে রান্না করা কোন খাবার খাবেন না তা কি হয় ? বৈচিত্রময় খাবার খেতে চলে যান সাবারাং,রঙরাঙ,কেবাং কিংবা মেজাং রেস্টুরেন্টে। আপনার এতোদিনের চেনা মুরগী কিংবা গরুর মাংস বা ডিমের রান্নার স্থানীয় প্রক্রিয়ার ভিন্নতর স্বাদ আর সুগন্ধ আপনার রসনা বিলাসকে সমৃদ্ধ করবে।
আপনার রাঙামাটির ভ্রমণ সুন্দর হোক।
ফজলে এলাহী