20/05/2026
কুরবানী বিষয়ক সংক্ষিপ্ত দলীলভিত্তিক মাসআলা
(কুরআন, সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য ফিকহের কিতাবের আলোকে)
কুরবানী সংক্রান্ত বিভ্রান্তির জবাবে সংক্ষিপ্ত দলীলভিত্তিক উপস্থাপনা
১. প্রশ্নঃ কুরবানী ব্যক্তি নাকি পরিবারের উপর ওয়াজিব?
উঃ কুরবানী পুরো পরিবারের উপর নয়; বরং প্রত্যেক সামর্থ্যবান, প্রাপ্তবয়স্ক, মুকীম মুসলিম ব্যক্তির উপর আলাদাভাবে ওয়াজিব।
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন—
«مَنْ وَجَدَ سَعَةً فَلَمْ يُضَحِّ فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا»
“যে ব্যক্তি সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও কুরবানী করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটেও না আসে।”
— সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস: ৩১২৩
— মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ৮২৭৩
এখানে «مَنْ» (যে ব্যক্তি) শব্দ দ্বারা ব্যক্তিকে উদ্দেশ্য করা হয়েছে।
ফিকহের কিতাবে এসেছে—
«تجب الأضحية على كل حر مسلم مقيم موسر»
“প্রত্যেক স্বাধীন, মুসলিম, মুকীম ও সামর্থ্যবান ব্যক্তির উপর কুরবানী ওয়াজিব।”
— আল-হিদায়াহ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৫৮
«الأضحية واجبة على الموسر»
“সামর্থ্যবানের উপর কুরবানী ওয়াজিব।”
— বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৬৩
২. প্রশ্নঃ কুরবানীর নেসাব কত?
উঃ কুরবানীর নেসাব যাকাতের নেসাবের সমপরিমাণ।
রুপার বারের বর্তমান (১ জিলহজ ১৪৪৭ হি.) পাইকারি বাজার মূল্য অনুযায়ী কুরবানীর নেসাব তথা ৫২.৫ ভরি রুপা (৬১২.৩৬ গ্রাম)-এর মূল্য আনুমানিক—
৩৪০০ × ৫২.৫ = ১,৭৮,৫০০ টাকা
(এক লক্ষ আটাত্তর হাজার পাঁচশত টাকা)
সুতরাং যার মালিকানায় নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বাদ দিয়ে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকবে, তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে।
এছাড়াও কারো মালিকানায় যদি সাড়ে সাত ভরি স্বর্ণ (প্রায় ৮৭.৪৮ গ্রাম) অথবা তার সমমূল্যের সম্পদ থাকে— যেমন:
স্বর্ণের বার
অলংকার
স্বর্ণমুদ্রা
নগদ অর্থ
ব্যবসায়িক পণ্য
সঞ্চয়পত্র ইত্যাদি
তাহলেও তার উপর কুরবানী ওয়াজিব হবে।
ফিকহের কিতাবে এসেছে—
«هي واجبة على كل حر مسلم مقيم موسر»
— রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩১২
— ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ২৯২
৩. প্রশ্নঃ শুধুমাত্র উটই কুরবানী দিতে হবে?
উঃ না। উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা— সবই কুরবানীর জন্য জায়েয।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَىٰ مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ﴾
“আমি প্রত্যেক উম্মতের জন্য কুরবানীর বিধান দিয়েছি, যাতে তারা আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে ঐসব চতুষ্পদ জন্তুর উপর যা তিনি রিযিক হিসেবে দিয়েছেন।”
— সূরা হাজ্জ: ৩৪
জাবির রা. বলেন—
«نَحَرْنَا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ الْبَدَنَةَ عَنْ سَبْعَةٍ وَالْبَقَرَةَ عَنْ سَبْعَةٍ»
“আমরা রাসূল ﷺ-এর সাথে উট সাতজনের পক্ষ থেকে এবং গরু সাতজনের পক্ষ থেকে কুরবানী করেছি।”
— সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৩১৮
ফিকহের কিতাবে এসেছে—
«والأضحية من الإبل والبقر والغنم»
“উট, গরু ও ছাগলজাতীয় পশু দ্বারা কুরবানী হবে।”
— আল-মাবসূত, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ৮
৪. প্রশ্নঃ একটি পশুতে সাত শরীক মিলে কুরবানী দেওয়া যাবে?
উঃ হ্যাঁ। উট ও গরু জাতীয় বড় পশুতে সর্বোচ্চ সাতজন শরীক হতে পারবে।
জাবির রা. থেকে বর্ণিত—
«أَمَرَنَا رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَنْ نَشْتَرِكَ فِي الْإِبِلِ وَالْبَقَرِ كُلُّ سَبْعَةٍ فِينَا فِي بَدَنَةٍ»
“রাসূল ﷺ আমাদেরকে উট ও গরুতে সাতজন করে শরীক হতে নির্দেশ দিয়েছেন।”
— সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৩১৮
ফিকহের কিতাবে এসেছে—
«تجوز البدنة والبقرة عن سبعة»
“উট ও গরু সাতজনের পক্ষ থেকে যথেষ্ট হবে।”
— আল-হিদায়াহ, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৬১
— বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৭১
৫. প্রশ্নঃ গোশত তিন ভাগ করা কি জরুরি?
উঃ গোশত তিন ভাগ করা ফরয বা ওয়াজিব নয়; বরং মুস্তাহাব ও উত্তম আমল।
এক ভাগ নিজের জন্য, এক ভাগ আত্মীয়ের জন্য, এক ভাগ গরীবদের জন্য রাখা উত্তম।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿فَكُلُوا مِنْهَا وَأَطْعِمُوا الْبَائِسَ الْفَقِيرَ﴾
“তোমরা তা থেকে খাও এবং অভাবগ্রস্ত দরিদ্রকে খাওয়াও।”
— সূরা হাজ্জ: ২৮
রাসূল ﷺ বলেন—
«كُلُوا وَادَّخِرُوا وَتَصَدَّقُوا»
“তোমরা খাও, সঞ্চয় কর এবং সদকা কর।”
— সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৫৬৯
ফিকহের কিতাবে এসেছে—
«ويستحب أن يتصدق بالثلث»
“এক-তৃতীয়াংশ সদকা করা মুস্তাহাব।”
— রদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩১৭
৬. প্রশ্ন: খাসি বা বলদ দিয়ে কুরবানী সহীহ হবে?
৬. খাসি বা বলদ দিয়ে কুরবানী সহীহ হবে?
উঃ হ্যাঁ। খাসি, বলদ, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা— সব দ্বারাই কুরবানী সহীহ হবে।
আনাস রা. বলেন—
««ضَحَّى النَّبِيُّ ﷺ بِكَبْشَيْنِ أَمْلَحَيْنِ أَقْرَنَيْنِ»»
“রাসূল ﷺ দুটি সাদা-কালো শিংওয়ালা দুম্বা কুরবানী করেছেন।”
— সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৫৫৮
— সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৯৬৬
অন্য বর্ণনায় এসেছে—
««كَانَا خَصِيَّيْنِ»»
“দুটি খাসি ছিল।”
— মুসনাদে আহমাদ, হাদীস: ১৩২১০
— সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস: ৩১২২
এ দ্বারা খাসি পশু দ্বারা কুরবানীর বৈধতা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়।
আর বলদ যেহেতু গরুরই অন্তর্ভুক্ত, তাই গরুর কুরবানীর সকল দলীলই বলদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
জাবির রা. বলেন—
««وَالْبَقَرَةَ عَنْ سَبْعَةٍ»»
“গরু সাতজনের পক্ষ থেকে যথেষ্ট।”
— সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৩১৮
ফিকহের কিতাবে এসেছে—
««الخصي أفضل من الفحل»»
“খাসি পশু অনেক সময় অখাসি পশুর চেয়েও উত্তম।”
— বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৭৯
আরও এসেছে—
««ولا بأس بالخصي»»
“খাসি পশু দ্বারা কুরবানীতে কোন অসুবিধা নেই।”
— আল-মাবসূত, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ১৪
৭. প্রশ্নঃ ওয়াজিব কুরবানীর সাথে আকীকা বা নফল কুরবানী শরীক করা যাবে?
উঃ হ্যাঁ। বড় পশুতে কারও ওয়াজিব কুরবানী, কারও আকীকা, কারও নফল— একসাথে শরীক হতে পারবে।
ফিকহের কিতাবে এসেছে—
«إذا اشترك سبعة في بدنة أو بقرة وأراد بعضهم العقيقة وبعضهم الأضحية جاز»
“সাতজন যদি উট বা গরুতে শরীক হয় এবং কারও নিয়ত আকীকা, কারও কুরবানী হয়— তবে তা জায়েয।”
— ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩০৪
— বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৭১
গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
৮. প্রশ্নঃ শরীকদের কেউ যদি শুধু গোশত খাওয়ার নিয়ত করে অথবা হারাম টাকা শরীকে মিশায় তাহলে কি কুরবানী সহীহ হবে?
উঃ কুরবানীর শরীকদের প্রত্যেকের নিয়ত ইবাদতের হতে হবে।
যদি কোন শরীক শুধু গোশত খাওয়ার নিয়ত করে অথবা তার অংশে হারাম সম্পদের সংমিশ্রণ থাকে, তাহলে সকল শরীকের কুরবানী নষ্ট হয়ে যাবে।
ফিকহের কিতাবে এসেছে—
«وإن كان أحد الشركاء كافراً أو أراد اللحم لا يجوز عن واحد منهم»
“যদি শরীকদের কেউ কেবল গোশতের উদ্দেশ্য করে, তাহলে কারও পক্ষ থেকেই কুরবানী সহীহ হবে না।”
— বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৭২
আরও এসেছে—
«لأن القربة لا تتجزأ»
“কারণ ইবাদত (কুরবানী) বিভক্ত হয় না।”
— আল-মাবসূত, খণ্ড ১২, পৃষ্ঠা ১৪
সুতরাং শরীকদের সকলের নিয়ত ইবাদতের হওয়া জরুরি।
শুধু গোশত খাওয়া, ব্যবসায়িক উদ্দেশ্য বা হারাম উপার্জনের অংশ মিশানো থেকে সতর্ক থাকা আবশ্যক।
গুরুত্বপূর্ণ: হারাম সম্পদ দ্বারা কুরবানী করলে কুরবানীর সওয়াব পাওয়া যায় না; বরং তওবা করা জরুরি।
আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا﴾
“নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র; তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া গ্রহণ করেন না।”
— সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০১৫
✅ কুরবানী একটি মহান ইবাদত
✅ সহীহ আকীদা ও সুন্নাহ অনুযায়ী আদায় করা জরুরি
✅ কুরআন, সহীহ হাদীস ও নির্ভরযোগ্য ফুকাহায়ে কেরামের বক্তব্যই মুসলমানের জন্য নিরাপদ পথ
✅ আবেগ, সমাজের প্রচলন বা ভিত্তিহীন বক্তব্য নয়; দলীলই মুসলমানের মূল ভিত্তি
নির্ভরযোগ্য সূত্রসমূহ
আল-কুরআনুল কারীম
সহীহ বুখারী
সহীহ মুসলিম
সুনানে ইবনে মাজাহ
মুসনাদে আহমাদ
আল-হিদায়াহ
বাদায়েউস সানায়ে
রদ্দুল মুহতার
ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া
আল-মাবসূত
লিখেছেন-
ইমাম ওলামা পরিষদের সদস্য
মুফতি জাহিদ আল জামি (হাফিযাহুল্লাহ)
প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক: ইসলামিক রিসার্চ সেন্টার, রংপুর।
ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান মুফতী: শরীয়াহ ও ফতোয়া বোর্ড, ডিএসসি।