16/09/2018
দো‘আর আদব :
দো‘আর বেশ কিছু আদব রয়েছে, যেগুলো অনুসরণ করলে দো‘আ কবুলের আশা করা যায়। নিম্নে দো‘আর কয়েকটি আদব উল্লেখ করা হল : কবুল কবুল
1. একনিষ্ঠভাবে আল্লাহ তা‘আলার কাছে দো‘আ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ ٱدۡعُونِيٓ أَسۡتَجِبۡ لَكُمۡۚ ﴾ [غافر: ٦٠]
‘তোমরা আমার কাছে দো‘আ কর, আমি তোমাদের দো‘আয় সাড়া দেব।[গাফির : ৬০।]
2. উযু অবস্থায় দো‘আ করা। যেহেতু দো‘আ একটি ইবাদত তাই উযু অবস্থায় করাই উত্তম।
হাতের তালু চেহারার দিকে ফিরিয়ে দো‘আ করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘তোমরা যখন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করবে তখন হাতের তালু দিয়ে প্রার্থনা করবে। হাতের পিঠ দিয়ে নয়।[আবূ দাউদ : ১৪৮৬।]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আমল সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে,
‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দো‘আ করার সময় হাতের তালু তাঁর চেহারার দিকে রাখতেন।’ [তাবারানী : ১১/১২২-৩৪] এটিই প্রয়োজন ও বিনয় প্রকাশের সর্বোত্তম পন্থা, যাতে একজন অভাবী কিছু পাবার আশায় দাতার দিকে বিনয়াবনত হয়ে হাত বাড়িয়ে দেয়।
৩. হাত তোলা। প্রয়োজনে এতটুকু উঁচুতে তোলা যাতে বগলের নিচ দেখা যায়। রাসূলুল্লাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামবলেন,
‘যে ব্যক্তি তার উভয় হাত উঠায় এবং আল্লাহর কাছে কোন কিছু চায়, আল্লাহ তাকে তা দিয়েই দেন।’ [তিরমিযী : ৩৬০৩]
1. আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করা এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামএর ওপর সালাত ও সালাম পাঠ করা।
ফুযালা ইবন উবায়েদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাতের মধ্যে এক ব্যক্তিকে এভাবে দো‘আ করতে শুনলেন যে, সে আল্লাহ তা‘আলার প্রশংসা করল না, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওপর সালাত ও সালাম পাঠ করল না। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, ‘এ লোকটি তাড়াহুড়া করল।’ এরপর তিনি বললেন,
‘তোমাদের কেউ যখন দো‘আ করবে, তখন সে যেন প্রথমে তার রবের প্রশংসা করে এবং তার স্তুতি জ্ঞাপন করে। এরপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর ওপর সালাত ও সালাম পাঠ করে। অতঃপর যা ইচ্ছে প্রার্থনা করে।’ [আবূ দাউদ : ১৪৮৩]
অন্য হাদীসে এসেছে,
‘প্রত্যেক দো‘আ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি সালাত না পড়া পর্যন্ত বাধাপ্রাপ্ত অবস্থায় থাকে।’ [দায়লামী : ৩/৪৭৯১; সহীহুল জামে’ : ৪৫২৩]
নিজের জন্য ও নিজের আপনজনদের জন্য কল্যাণের দো‘আ করা, মন্দ বা অকল্যাণের দো‘আ না করা। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘বান্দার দো‘আ কবুল হয়, যতক্ষণ না সে কোনো পাপ কাজের বা আত্মীয়তার বন্ধন ছিন্ন করার দো‘আ করে।’[মুসলিম : ৭১১২]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন,
‘তোমরা তোমাদের নিজদের, তোমাদের সন্তান-সন্তুতির এবং তোমাদের সম্পদের ব্যাপারে বদদো‘আ করো না।’[মুসলিম : ৩০০৯]
2. দো‘আ কবুল হওয়ার দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে আল্লাহর কাছে দো‘আ করা।
‘কবুল হবার দৃঢ় বিশ্বাস নিয়ে তোমরা আল্লাহর কাছে দো‘আ কর। জেনে রাখো, নিশ্চয়ই আল্লাহ গাফেল ও উদাসীন হৃদয় থেকে বের হওয়া দো‘আ কবুল করেন না।’ [তিরমিযী : ৩৪৭৯]
দো‘আর সময় সীমা লঙ্ঘন না করা। সা‘দ রা. বলেন, হে বৎস! আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি :
‘অচিরেই এমন এক সম্প্রদায় আসবে যারা দো‘আয় সীমা-লঙ্ঘন করবে।’ [আহমদ : ১/১৭২]
আর সে সীমালঙ্ঘন হচ্ছে, এমন কিছু চাওয়া যা হওয়া অসম্ভব। যেমন, নবী বা ফেরেশতা হবার দো‘আ করা। অথবা জান্নাতের কোন সুনির্দিষ্ট অংশ লাভের জন্য দো‘আ করা।
3. বিনয় প্রকাশ ও কাকুতি-মিনতি করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ وَٱذۡكُر رَّبَّكَ فِي نَفۡسِكَ تَضَرُّعٗا وَخِيفَةٗ وَدُونَ ٱلۡجَهۡرِ مِنَ ٱلۡقَوۡلِ بِٱلۡغُدُوِّ وَٱلۡأٓصَالِ ﴾ [الاعراف: ٢٠٥]
‘আর তুমি নিজ মনে আপন রবকে স্মরণ কর সকাল-সন্ধ্যায় অনুনয়-বিনয় ও ভীতি সহকারে এবং অনুচ্চ স্বরে।’[আ‘রাফ : ২০৫]
4. ব্যাপক অর্থবোধক ও নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করা। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে শব্দ ও বাক্য ব্যবহার করেছেন তা জামে‘ তথা পূর্ণাঙ্গ ও ব্যাপক। এক বর্ণনায় এসেছে,
‘রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যাপক অর্থবোধক দো‘আ পছন্দ করতেন এবং অন্যগুলো ত্যাগ করতেন।’ [আবূ দাউদ : ১৪৮২।]
5. আল্লাহ তা‘আলার সুন্দর নামসমূহ ও তাঁর সুমহান গুণাবলির উসীলা দিয়ে দো‘আ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
﴿ وَلِلَّهِ ٱلۡأَسۡمَآءُ ٱلۡحُسۡنَىٰ فَٱدۡعُوهُ بِهَاۖ ﴾ [الاعراف: ١٨٠]
‘আল্লাহর রয়েছে সুন্দর নামসমূহ, সেগুলোর মাধ্যমে তোমরা তাঁর নিকট দো‘আ কর।’ [আ‘রাফ : ১৮০। ]
6. ঈমান ও আমলে সালেহ তথা নেক কাজের উসীলা দিয়ে দো‘আ করা।
ক. ঈমানের উসীলা দিয়ে দো‘আ করার উদাহরণ কুরআনুল কারীমে উল্লিখিত হয়েছে,
﴿ رَّبَّنَآ إِنَّنَا سَمِعۡنَا مُنَادِيٗا يُنَادِي لِلۡإِيمَٰنِ أَنۡ ءَامِنُواْ بِرَبِّكُمۡ فََٔامَنَّاۚ رَبَّنَا فَٱغۡفِرۡ لَنَا ذُنُوبَنَا وَكَفِّرۡ عَنَّا سَئَِّاتِنَا وَتَوَفَّنَا مَعَ ٱلۡأَبۡرَارِ ١٩٣ ﴾ [ال عمران: ١٩٣]
‘হে আমাদের রব, নিশ্চয় আমরা শুনেছিলাম একজন আহবানকারীকে, যে ঈমানের দিকে আহবান করে যে, ‘তোমরা তোমাদের রবের প্রতি ঈমান আন’। তাই আমরা ঈমান এনেছি। হে আমাদের রব আমাদের গুনাহসমূহ ক্ষমা করুন এবং বিদূরিত করুন আমাদের ত্রুটি-বিচ্যুতি, আর আমাদেরকে মৃত্যু দিন নেককারদের সাথে।’ [আলে-ইমরান : ১৯৩।]
খ. আমলে সালেহ তথা নেক কাজের উসীলা দিয়ে দো‘আ করার উদাহরণ হাদীসে উল্লিখিত হয়েছে,
‘তিন ব্যক্তি যাত্রাপথে রাত যাপনের জন্য একটি গুহায় আশ্রয় নেয়। হঠাৎ পাহাড় থেকে একটি পাথর খসে পড়ে গুহার মুখ বন্ধ হয়ে যায়। এমন অসহায় অবস্থায় তাদের প্রত্যেকে নিজ নিজ নেক আমলের উসীলা দিয়ে দো‘আ করে। একজন বৃদ্ধ পিতা-মাতার খেদমত, অপরজন অবৈধ যৌনাচার থেকে নিজকে রক্ষা এবং তৃতীয়জন আমানতের যথাযথ হেফাযতের উসীলা দিয়ে পাথরের এই মহা বিপদ থেকে মুক্তির জন্য আল্লাহর নিকট দো‘আ করলেন। তাদের দো‘আর ফলে পাথর সরে গেল। তারা সকলেই নিরাপদে গুহা থেকে বের হয়ে এলেন।’ [বুখারী : ২১১১।
7. নিজের গুনাহের কথা স্বীকার করে দো‘আ করা। উদাহরণস্বরূপ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মাছের পেটে থাকাবস্থায় ইউনুস আলাইহিস সালাম যে দো‘আর মাধ্যমে আল্লাহ তা‘আলাকে ডেকেছিলেন (অর্থাৎ لاَ إِلَهَ إِلاَّ أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِين লা ইলাহা ইল্লা আনতা সুবহানাকা ইন্নী কুনতু মিনায যালিমীন। ‘আপনি ছাড়া কোন ইলাহ নেই। আপনি পবিত্র মহান। নিশ্চয় আমি ছিলাম যালিম।’) যেকোনো মুসলমান ব্যক্তি তা দিয়ে দো‘আ করলে আল্লাহ তা‘আলা তার দো‘আ কবুল করে নেবেন।’ [তিরমিযী : ৫০৫৩; মুস্তাদরাক হাকেম : ৪৪৪৩]
8. উচ্চ স্বরে দো‘আ না করা; অনুচ্চ স্বরে দো‘আ করা। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
‘তোমরা তোমাদের রবকে ডাক অনুনয় বিনয় করে ও চুপিসারে। নিশ্চয় তিনি পছন্দ করেন না সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে।’ [আ‘রাফ : ৫৫।]
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
‘হে লোক সকল, তোমরা নিজদের প্রতি সদয় হও এবং নিচু স্বরে দো‘আ করো। কারণ তোমরা বধির বা অনুপস্থিত কাউকে ডাকছো না। নিশ্চয় তিনি (তাঁর জ্ঞান) তোমাদের সাথেই আছেন। তিনি অতিশয় শ্রবণকারী, নিকটবর্তী।’ [বুখারী : ৯২২৯; মুসলিম : ২৭০৪।]
9. আল্লাহর কাছে বারবার চাওয়া। কেননা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাই করতেন। ইবন মাসঊদ রা. বলেন,
‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দো‘আর বাক্যগুলো তিনবার করে বলতে এবং তিনি তিনবার করে ইস্তেগফার করতে পছন্দ করতেন।’ [মুসনাদ আহমদ : ১/৩৯৪।]
10. কিবলামুখী হয়ে দো‘আ করা। আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,
‘নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কা‘বামুখী হলেন। অতপর কুরাইশদের কয়েকজনের জন্য বদ-দো‘আ করলেন, তারা হল, শাইবা ইবন রবী‘আ, উতবা ইবন রবী‘আ, ওয়ালীদ ইবন উতবা এবং আবূ জাহল ইবন হিশাম। আল্লাহর কসম, আমি তাদেরকে মৃত অবস্থায় লুটিয়ে পড়ে থাকতে দেখলাম। রোদ তাদেরকে বদলে দিয়েছিল। তখন ছিল গরমের দিন।’ [বুখারী : ৩৯৬০; মুসলিম : ১৭৯৪। ]