28/05/2026
ইরানের (পারস্য) ইতিহাসের পূর্ণাঙ্গ টাইমলাইন
✅ অ্যাকিমেনিড সাম্রাজ্য (প্রথম পারসিক সাম্রাজ্য)
▪️ খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ – ৩৩০ অব্দ
সম্রাট সাইরাস দ্য গ্রেট (Cyrus the Great) এই প্রথম এবং প্রকৃত পারসিক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের বৃহত্তম সাম্রাজ্য, যা এশিয়া থেকে বলকান পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই বংশেরই বিখ্যাত রাজা ছিলেন প্রথম দরায়ুস এবং জার্মিজ। খ্রিস্টপূর্ব ৩৩০ অব্দে গ্রিসের আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট পারস্য আক্রমণ করে এই সাম্রাজ্যের রাজধানী পারসেপোলিস ধ্বংস করেন এবং পারস্য জয় করেন। আলেকজান্ডারের পর এখানে কিছুদিন গ্রিক 'সেলুকিড' বংশ শাসন করে।
✅ পার্থিয়ান সাম্রাজ্য (রোমানদের প্রতিদ্বন্দ্বী)
▪️খ্রিস্টপূর্ব ২৪৭ – ২২৪ খ্রিস্টাব্দ
গ্রিক শাসনের অবসান ঘটিয়ে পারস্যের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পার্থিয়ান উপজাতিরা আবার পারসিক শাসন ফিরিয়ে আনে। তারা প্রাচীন সিল্ক রোড বা রেশম পথ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছিল এবং তৎকালীন অপরাজেয় রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে সফলভাবে লড়াই করে তাদের পূর্ব দিকে অগ্রসর হওয়া আটকে দিয়েছিল।
✅সাসানীয় সাম্রাজ্য (ইসলাম-পূর্ব শেষ পারসিক সাম্রাজ্য)
▪️২২৪ – ৬৫১ খ্রিস্টাব্দ
পার্থিয়ানদের হটিয়ে সাসানীয়রা ক্ষমতা দখল করে এবং পারস্যের প্রাচীন জরোআস্ট্রিয়ান (অগ্নিউপাসক) ধর্ম ও সংস্কৃতিকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এক স্বর্ণযুগের সূচনা করে। এটি ছিল রোমান ও বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সমসাময়িক এক বিশাল পরাশক্তি।
✅ ইসলামী যুগ ও আরব শাসন (খিলাফত ও আঞ্চলিক রাজবংশ)
▪️৬৫১ – ১২১৯ খ্রিস্টাব্দ
সপ্তম শতাব্দীতে মুসলিমদের পারস্য বিজয়ের মাধ্যমে সাসানীয় সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। পারস্য উমাইয়া ও আব্বাসীয় খিলাফতের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং পারসিকরা দলে দলে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে। পরবর্তীতে বাগদাদের খিলাফত দুর্বল হলে পারস্যেই বেশ কিছু আধা-স্বাধীন মুসলিম রাজবংশের সৃষ্টি হয়, যেমন—সামানিদ, সেলজুক তুর্কি এবং সর্বশেষ খোয়ারিজমীয় সাম্রাজ্য। এই যুগে পারস্যের বিজ্ঞান, সাহিত্য ও দর্শনের চরম উৎকর্ষ ঘটে (যেমন: ইবনে সিনা, ওমর খৈয়াম)।
✅ মঙ্গোল আক্রমণ ও ইলখানাত শাসন
▪️ ১২১৯ – ১৩৮১ খ্রিস্টাব্দ
১২১৯ সালে চেঙ্গিস খান পারস্যের খোয়ারিজমীয় সাম্রাজ্য আক্রমণ করেন। মঙ্গোলরা পারস্যের বড় বড় শহর ও জ্ঞানকেন্দ্রগুলো পুড়িয়ে দেয় এবং নজিরবিহীন গণহত্যা চালায়। পরবর্তীতে চেঙ্গিস খানের নাতি হালাকু খান পারস্যে স্থায়ীভাবে 'ইলখানাত' রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। সময়ের সাথে সাথে এই মঙ্গোল শাসকরা নিজেরাই ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং পারসিক সংস্কৃতির ধারক হয়ে ওঠেন।
✅ তৈমুরীদ যুগ ও বিশৃঙ্খলা
▪️ ১৩৮১ – ১৫০১ খ্রিস্টাব্দ
মঙ্গোলদের পতনের পর মধ্য এশিয়ার তুর্কো-মঙ্গোল বিজেতা তৈমুর লং পারস্য আক্রমণ করে আবার ধ্বংসযজ্ঞ চালান। তার মৃত্যুর পর পারস্য বিভিন্ন ছোট ছোট উপজাতীয় শাসনে বিভক্ত হয়ে পড়ে এবং রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
✅ সাফাভিদ সাম্রাজ্য (আধুনিক ইরানের ভিত্তি)
▪️ ১৫০১ – ১৭৩৬ খ্রিস্টাব্দ
শাহ ইসমাইল প্রায় ৮৫০ বছর পর পারস্যকে আবার একটি একক স্বাধীন সাম্রাজ্যের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করেন। তিনি দ্বাদশী শিয়া ইসলামকে পারস্যের রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণা করেন, যা পারস্যকে তার সুন্নি প্রতিবেশী অটোমানদের থেকে পৃথক ধর্মীয় পরিচয় দেয়। শাহ আব্বাসের আমলে এই সাম্রাজ্য শিল্প ও স্থাপত্যের শীর্ষে পৌঁছায়। ১৭২২ সালে আফগানদের আক্রমণে এই বংশের পতন শুরু হয়।
✅ আফশারিদ, জান্দ ও কাজার রাজবংশ
▪️ ১৭৩৬ – ১৯২৫ খ্রিস্টাব্দ
🔹আফশারিদ (১৭৩৬-১৭৪৭): সামরিক বীর নাদির শাহ আফগানদের তাড়িয়ে নিজে সম্রাট হন এবং ভারতের দিল্লি লুণ্ঠন করেন।
🔹জান্দ (১৭৫১-১৭৯৪): করিম খান জান্দের অধীনে পারস্যে একটি সংক্ষিপ্ত শান্তিপূর্ণ ও সাংস্কৃতিক যুগ আসে।
🔹কাজার (১৭৯৪-১৯২৫): আগা মোহাম্মদ খান কাজার তেহরান-কে রাজধানী বানান। এই যুগে ইরান আধুনিক যুগে প্রবেশ করলেও ব্রিটিশ ও রুশ সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক চাপে অনেক ভূখণ্ড হারায়।
✅পাহলভি রাজবংশ (শেষ রাজতন্ত্র)
▪️১৯২৫ – ১৯৭৯ খ্রিস্টাব্দ
রেজা শাহ পাহলভি এবং তার পুত্র মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভির অধীনে ইরান একটি পশ্চিমা ধাঁচের, ধর্মনিরপেক্ষ ও আধুনিক রাষ্ট্রে পরিণত হয়। ১৯৩৫ সালে পারস্যের নাম আনুষ্ঠানিকভাবে বদলে আন্তর্জাতিকভাবে 'ইরান' রাখা হয়। তবে শাহের একনায়কতন্ত্র ও অতিরিক্ত পশ্চিমা সংস্কৃতির প্রভাব দেশের সাধারণ মানুষ ও ধর্মীয় সমাজকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।
✅ ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান
▪️ ১৯৭৯ – বর্তমান (২০২৬)
আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির নেতৃত্বে ১৯৭৯ সালে ঐতিহাসিক 'ইসলামী বিপ্লব' ঘটে। আড়াই হাজার বছরের রাজতন্ত্রের অবসান ঘটিয়ে ইরান একটি শিয়া ইসলামী প্রজাতন্ত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে, যা আজ পর্যন্ত সুপ্রিম লিডার এবং রাষ্ট্রপতির মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।