17/02/2024
প্রসঙ্গ : সাংবাদিকতা ও সাম্বাদিকতা কিংবা হাম্বা..
‘সাংবাদিকরা হচ্ছে সমাজের দর্পণ স্বরূপ’ এই নীতি বাক্যের বোধহয় মৃত্যু হয়েছে বহু আগে। এখন বাংলাদেশসহ পৃথিবীব্যাপি যে সাংবাদিকতার রূপ দাঁড়ায় তা আগাগোড়ায় কতকিছু এই সেই কিংবা ‘প্রশ্নবোধক’ কিংবা ‘আশ্চর্যরবোধক’ চিহ্ন জোড়ে দেয়া যায়। আজকাল আবার একেকজন একেক চ্যানেলের মালিক ও সাংবাদিক, সম্পাদক এবং প্রকাশক। জীবনের একটু সময় আমিও এই ‘মহান’ পেশার সাথে জড়িত ছিলাম। অভিজ্ঞতা ভালো নয়।
তাহলে চলেন, আগে অভিজ্ঞতার কথা বলি। আমি সিলেটের দুটি স্থানীয় পত্রিকায় কাজ করেছি প্রায় ৬ বছর। এই ৬ বছরে সিলেট শহরে কিংবা বৃহত্তর সিলেট মিলিয়ে হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া আর তেমন নীতি নৈতিকতাসমৃদ্ধ সাংবাদিক খোঁজে পাইনি। হয়ত সেটা আমার একান্ত দূর্বতা কিংবা জানাশোনার ঘাটতি। কিন্তু এই নীতি নৈতিকতার প্রশ্নে যখন ‘সাংবাদিক’এর প্রতি প্রশ্ন’ উঠে যায় তাহলে সমাজের ‘দর্পণ’ বা ‘আয়না’টার রূপ কি হতে পারে ভাবুন। বলবেন, সেটা সব পেশাতেই কম বেশ আছে। হ্যাঁ আছে, কিন্তু ‘দর্পণ’ যখন বলছেন, তখন সেই দর্পণকে পরিচ্ছন্ন রাখার দায়িত্ব এই পেশায় চালিত অগ্রজদের।
একটি ছোট্ট ঘটনা বলি, ২০২২ সালে সিলেটের একটি প্রেসক্লাবের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সাধারণত সেই নির্বাচনগুলো প্যানেলভিত্তিক হওয়াতে কোনো প্রার্থীরই যোগ্যতা-অযোগ্যতার যাছাই-বাছাই নিরেট করা যায় না। কিন্তু এই প্যানেল নির্বাচন সাংবাদিকদের গণতান্ত্রিক ভোট প্রয়োগে চুড়ান্ত বাধাগ্রস্ত করে। নিজের ইচ্ছায় ভোট প্রদান করা যায় না। কাউকে ছোট করছি না, এটা হয়ত বহুদিনের চর্চা; জাতীয় পর্যাায়েও হচ্ছে এবং হবে। কিন্তু আমি নিজের পছন্দে ভোট প্রদান করতে পারিনি।
এতেও বলবেন, তাতে কি হয়েছে? হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ও বুদ্ধিজীবী স্মৃতিসৌধে একজন ‘নামকরা সাংবাদিক’ কয়েকজন ছেলে-মেয়েকে দাওয়া করেন এবং সরাসরি সম্প্রচার করেন। এটা নিয়ে আলোচনা সমালোচনা আছে, হয়েছে এবং চলছে। কিন্তু আমার প্রশ্ন এই ‘নামকরা সাংবাদিক’টা কে ভাই? উড়ে এসেছে? তিনি শুধু সাংবাদিক নন, একটি সাংবাদিক সংগঠনের ‘পাঠাগার বিষয়ক সম্পাদক’। ভোটের মাঠে লড়াই করে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন। ভোট আবার সাধারণ মানুষ দেয়নি, নামকরা সাংবাদিকরাই দিয়েছেন।
তো স্বাভাবিকভাবেই আমার প্রশ্ন, এইরকম সাংবাদিকদের আপনে নেতা বানাবেন, আবার সমালোচনা করবেন তা কি করে হয়! নিজের সংগঠনের ভোটে ‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠা করতে পারেন না, আর দেশের বা জাতীয় নির্বাচনে ‘গণতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার আওয়াজ তুলবেন তা কিভাবে সম্ভব!
এটা শুধু উদাহরণ দেয়ার জন্য। আর এই উদাহরণটা নেহায়েতই ছোট ও দূর্বল। জাতীয় পর্যা য়ে বা অন্যান্য সাংবাদিক সংগঠনগুলোর অবস্থা তার থেকে উন্নত সেটা কল্পনা করাও দুষ্কর। কিন্তু সংগঠন বা এরকম ঘটনা দিয়ে সাংবাদিক বিচার করতে আমি চাইনি। কেনোনা আমার যারা অভিভাবক ছিলেন বা আমি যাদের সংস্পর্শে কাজ শিখতে গিয়েছি তাদের অনেকেই সফল ও নীতি নৈতিকতার প্রশ্নে অটল পেয়েছি। কয়েকজনকে মাপকাটিতে বিচার করতে পারিনি। অবশ্যেই আমার সেই বিচার করার মাপকাটি বা অভিজ্ঞতা ছিলো না, এখনও নেই।
এটা শুধু আমার দেখা অভিজ্ঞতার আলোকে বিচার হতে পারে। এটা জাতীয় ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক পর্যাটয়ে আরও করুণ অবস্থা। রয়টার্স থেকে শুরু করে সিলেটের ‘বারুদ’ নামক সাপ্তাহিক কেউই উতরে যাবার নয়।
একটা বিষয় লক্ষ্য করবেন, সাংবাদিকরা যে সমাজের বা রাষ্ট্রের ‘দর্পণ’ এর জায়গা থেকে কবে ছিটকে পড়েছে তা সহজেই চোখে পড়বে। যেমন বইমেলায় মোস্তাক-তিশার বই প্রকাশ ও তাদের সাংসারিক পথ ও পন্থা নিয়ে টকশো, আলোচনা ও সংবাদ উপস্থাপনার ভঙ্গি- বাপরে! এদের সংসারের সংবাদ যেনো হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাটের চেয়েও বেশি ও বড়। আবার একজন লেখক, অনেক পরিশ্রম করে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার জন্য কয়েকটি বই প্রকাশ করেছেন, নিজে ফেরি করে বই বিক্রি করেছেন, করছেন। মানুষের ধারে ধারে যাচ্ছেন, সেখানে তিনি তিনটি শব্দের উত্তর দিতে পারেননি, তাতেই হুলুস্তুল! সাংবাদিকের প্রশ্নও দেখেছেন? হাতে থাকা ‘বোম’গুলোতে নামের বাহার দেখে বুঝবেন এখানের সবগুলোই জাতীয় সংবাদ মাধ্যম।
আমি এমন একজন লোক বোধ জানি না যে প্রতিবছর বইমেলা আয়োজনে কতটাকা বাজেট হয়, কত ব্যয় হয় এবং কত আয় হয়। আর যেটা কেউই জানে না তাতে কতটাকা লোপাট হয়। এরকম সরকারি, আধাসরকারি কিংবা নির্মাণ-বিনির্মাণে কত টাকা কার পকেটে ঢুকেছে তা আমরা জানতে পারি না, কেনোনা সাংবাদিকরা সেগুলো জানাতে এখন আগ্রহ কিংবা দায়িত্ববোধ হারিয়ে ফেলেছেন। এখন সবাই যেনো ভাইরাল কিংবা ভিউয়ার অথবা তৈলাক্ত বাঁশে বাদরের উঠানামায় ব্যস্ত।
নিজেদের আখের গোছাতে সবাই দৌড়ঝাপে মেতে উঠেন। আপনারা হয়ত জানেন, সিলেটের একমাত্র মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সাংবাদিক কৌটায়’ কতজন দৌড়ঝাপ করেছেন, কতজনের আত্মীয়-স্বজনের চাকরি হয়েছে, কত সিনিয়র যাদের কাছে আমরা প্রতিনিয়ত শিখি ও জানি নীতি নৈতিকতা তাদের কয়েকজনকে দেখে আমি ব্যক্তিগতভাবে অবাক হয়েছি। আমার প্রিয় একজন ছিলেন, বুঝতে পেরে তিনি অবশ্যই সেখান থেকে সরে এসেছেন; আমিও সরাসরি ফোনে আমার অবাক হওয়ার বিষয় উনাকে জানিয়েছি। এরকম যদি সারা বাংলাদেশের দৃশ্য দেখে বিচার করেন, তাহলে বলেন তো; যে এরকম একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বা কোনো প্রতিষ্ঠান থেকে নিজের ব্যক্তিগত ফায়দা নিতে পারেন, তিনি কখনও সেই প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তির সত্য সংবাদ হলেও প্রকাশ করতে পারবেন? হয়ত পারবেন, কিন্তু আমরা তেমনটি দেখিনি।
একতরফা ‘বিপরীতমুখী’ কথা বলছি তাই বলে সাংবাদিকরা সত্য সঠিক সংবাদ করেন না তা কিন্তু নয়। কিন্তু, একসময় ‘সাংবাদিক’ পরিচয় দিলে ‘সরকার’ও ‘থতমত’ বা ‘ভীমড়ি’ খেয়ে যেতেন, আজকাল তা হয় কি না আমার জানা নেই। তবে, এই বছর চারেক আগেও আমরা সাংবাদিকদের বলিষ্ঠ ভূমিকার সাক্ষি ছিলাম, সত্য প্রকাশের ভরসায় ছিলাম। আজকাল কোনটা সত্য আর কোনটা পক্ষপাতিত্বমুলক সংবাদ তাও বুঝতে পারি না। তাহলে সেই ‘আয়না’ বা ‘দর্পণ’কে আপনে কি বলবেন?
আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বদৌলতে যেসব ‘সাম্বাদিক’দের আগাছা জন্মাচ্ছে, তাতে কয়েকদিন পর সত্যিকারের কিংবা মূলধারার সাংবাদিকদেরও মানুষ ‘হাম্বা…’ বলে সম্বোধন করবে। সেক্ষেত্রে নিজেরাও কম দায়ি নয়।
ইয়াকুব আলী
সাবেক সাংবাদিক!