09/14/2026
পলাশের কথা কন ? হেতার তো ভাব বেশি, হ্যার লগে আমগো হইব না ('আফনে বসুনিয়ারে চেনেন নি ?' -এর দ্বিতীয় পর্ব )
'আফনে বসুনিয়ারে চেনেন নি' শিরোনামে কয়েকদিন আগে লেখা আমার আর্টিকেলটি যারা পড়েছিলেন, তারাই কেবল স্পষ্টভাবে এবারে লেখা দ্বিতীয় পর্বের ধারাবাহিকতা বুঝতে পারবেন । মনে আছে তো সেই সবজান্তা, সর্ববিষয়ে মহাপন্ডিত আইনস্টাইনের কথা যাকে নিয়েই আগের আর্টিকেলটি লিখেছিলাম ?
বসুনিয়া স্যার সংক্রান্ত আলাপ শেষ হওয়ার পরে উনি আমাকে বেশ দাম্ভিকতা ও আভিজাত্যের সাথে বললেন যে, উনার আগের বানানো পাশের হাইরাইজ কমার্শিয়াল বিল্ডিংটা ডিজাইন করেছেন একজন আমেরিকান আর্কিটেক্ট যে কারনে ওই বিল্ডিংয়ের নাম-ডাক এবং স্হাপত্যশৈলীর নান্দনিকতা এখন বাংলাদেশের গন্ডি ছাড়িয়ে সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে । পাঠক, চুপিচুপি আমি আপনাদেরকে বলে রাখি, ওই বিল্ডিংয়ের ডিজাইন একেবারেই সাধারণ আটপৌরে যা হয়তো বুয়েটে আর্কিটেকচারে ফাইনাল ইয়ারে পড়া কোনো স্টুডেন্টই করতে পারবে ।
আমেরিকান আর্কিটেক্টের কথা শুনে ভিতরে ভিতরে আমি যা বুঝার তা বুঝে গিয়েছি মিলি-সেকেন্ডের মধ্যেই । কারন লুই ক্যানের ডিজাইনে গড়া সংসদ ভবন ছাড়া সাদা চামড়ার সুদর্শন বা নাদুসনুদুস অন্য কোনো আমেরিকান বা ইউরোপীয়ান আর্কিটেক্টের ডিজাইনে করা অন্য কোনো বিল্ডিংয়ের কথা আমি ঢাকা শহরে শুনি নাই, আমার জানার বাহিরে থাকলেও থাকতে পারে । যা কিছু শুনেছি তা ইন্ডিয়ান, শ্রীলঙ্কান, মালয়েশিয়ান বা থাই কিছু আর্কিটেক্টের ডিজাইনের কথা যদিও সেইগুলিকেও বাংলাদেশের প্রখ্যাত বা ভালো মানের আর্কিটেক্টদের ডিজাইন করা স্হাপনাগুলির চাইতে উন্নতমানের কোনো কিছু মনে হয়নি আমার কাছে কখনোই ।
যা হোক, সর্ববিষয়ে জ্ঞানী মহাপন্ডিতমশাইকে উনার সভাসদবর্গ এবং আমার কলিগদের সামনে বাজিয়েই আমি উনার মুখ থেকেই সত্য উদঘাটন করতে চাই । আমি উনাকে বললাম যে, আপনার আগের হাইরাইজ টাওয়ারের আমেরিকান আর্কিটেক্ট কি আমেরিকান বংশদ্ভূত সাদা চামড়ার মানুষ ? না-কি বুয়েট থেকে পাস করে আমেরিকাতে গিয়ে সেটেল্ড হয়ে এখন আমেরিকার পাসপোর্টধারী আমেরিকান নাগরিক ?
যেহেতু তার নিজের সভাসদবর্গের সামনে জিজ্ঞেস করেছি, তাই মহাজন তো সরাসরি অসত্য তথ্য দিতে পারছেন না । উনি বললেন, হ, হেতায় বুয়েট থাইক্যা পাস কইরাই আমেরিকা গেছেন, আমেরিকাতে তার সাথে আমেরিকান লোকজনও আছে তার ফার্মে বিজনেস পার্টনার হিসেবে । জাতে মাতাল তালে ঠিক, সাদা চামড়ার একটু স্মেল রেখে দিল উত্তর দেওয়ার সময় ।
আমার যা বোঝার তাই বুঝলাম । তবে এইটা বুঝলাম না যে, আদৌ উনি যার কথা বলেছেন তিনি সত্যিই আমেরিকাপ্রবাসী বুয়েটিয়ান কি-না ; না-কি অন্য যে কোনো রকমের ভিসায় আমেরিকা গিয়ে কোনো ওলি-গলি থেকে ভুংভাং ডিপ্লোমা নেওয়া কেউ যে কি-না গপ্পবাজি করে এই অর্ধশিক্ষিত বাচাল আইনস্টাইন মহাজনের কাছে বিশাল আন্তর্জাতিক মানের আমেরিকান আর্কিটেক্ট বনে গেছেন ।
আমি তখন উনাকে বললাম যে, বাংলাদেশেই তো অনেক ভালো ভালো আর্কিটেক্ট আছেন, আপনি তো উনাদের মাধ্যমে ডিজাইন করাতে পারেন, আমেরিকান আর্কিটেক্টের কাছে যাওয়ার দরকার কী ? তখন উনি আমাকে জিগাইলেন, বাংলাদেশে কে আছে নামকরা আর্কিটেক্ট ?
আমি চিন্তা করলাম, আমাদের সিনিয়র, জুনিয়র, বন্ধু অনেকেই তো আছেন ভালো আর্কিটেক্ট ; কিন্তু মহাজনের যে ভাবসাব তাতে উনাকে প্রথমে একটু রিনাউন্ড কয়েকজনের নাম বলতে হবে । তখন মহাজন (চেয়ারম্যান সাহেব) উনার পাশে বসা এমডি, ডিরেক্টর, জিএম, ম্যানেজারকে প্রচন্ড ধমকের সুরে বললেন ডায়েরি-খাতা খুলে আমি যে বাংলাদেশি আর্কিটেক্টদের নাম বলব সেগুলো নোটডাউন করার জন্য । উনারা কাগজে কলম ধরলেন । কেউ বিশ্বাস না করলেও এটা সত্য যে ওই চেয়ারম্যান মহাজন তাদের ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে জুনিয়র এমপ্লয়ীর মতো করেই ধমকিয়ে কথা বলেন ।
আমি প্রথমে বললাম আর্কিটেক্ট মুস্তাফা খালিদ পলাশ ভাইয়ের কথা । উনার নাম শুনেই মহাজন বলে উঠলেন, 'পলাশের কথা কন ? হেতার তো ভাব বেশি, হ্যার লগে আমগো হইব না' । আমি বললাম যে, উনি উনার ডিজাইনের ক্ষেত্রে একটু কনজারভেটিভ থাকেন যাতে কাজ করতে গিয়ে অন্য কোনো কাজের লোকের কথায় ডিজাইনে কোনো ডেভিয়েশন করা না হয় । আর তাছাড়া উনি শিল্প-সাহিত্য-মিউজিক নিয়ে কিছুটা ব্যস্ত থাকেন, ওইগুলো আলাদ বিষয়, উনার প্যাশন । আর উনাকে দেখে একটু ভাবগম্ভীর মনে হয়, তবে ব্যক্তিগতভাবে মানুষ হিসেবে আসলে অতটা কঠোর না । যা হোক, শেষ পর্যন্ত উনি বললেন, 'পলাশ ছাড়া আর কে আছে ? ' ।
সম্ভবতঃ বেইলি রোডের রেস্টুরেন্টে অগ্নিকাণ্ডের পরে পলাশ ভাই উনার আর্কিটেকচারাল এথিক্সের জায়গা থেকে কিছু কঠোর কথা বলার পরে তা স্যোশাল মিডিয়াতে ব্যাপকভাবে ভাইরাল হওয়া আর এর পরদিন থেকেই রাজউকের সিজনাল অপারেশন শুরু হওয়ার কারনে বেশ কিছু ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াতে উনি এখন টাওয়ার মালিকদের কাছে, রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ীদের কাছে আগের চাইতে অজনপ্রিয় হয়ে গেছেন ।
মহাজন নিজেকে সবজান্তা শমসের মনে করলেও তার সত্যিকারের জ্ঞান কোনোদিন কোনো বিষয়ে কোথাও কারো কাছ থেকে যা একটু শুনে সেটাকে চরম সত্য বলে যে ভেবে নিয়েছে, ওই পর্যন্তই । তাই তাকে যে কোনো বিষয় বলার সময় একটু বুঝিয়ে বলতে হয় । আমি দ্বিতীয়জনের নাম বলা শুরু করতেই তিনি প্রচন্ড ধমক দিয়ে তাদের এমডি, ডিরেক্টরকে সাইজমতো কলম ধরতে বললেন যাতে সঠিকভাবে নামটি লিপিবদ্ধ করা হয় ।
এবার আমি বলা শুরু করলাম ফয়েজ ভাইয়ের কথা, লিখতে বললাম, উনার অফিসিয়ালি প্রোফেশনাল পরিচয় আর্কিটেক্ট ফয়েজুল্লাহ হিসেবে । পাগলায় আমার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় ফয়েজ ভাইয়ের বিশেষত্ব জানতে চায় । আমি বলা শুরু করলাম, ঢাকা শহরের প্রথম মেগাশপিং মল বসুন্ধরা সিটি ডিজাইন করার সময় পলাশ ভাই আর ফয়েজ ভাই একসঙ্গে কাজ করেছিলেন, সেখান থেকে । এরপর কক্সবাজারের নান্দনিক রেলস্টেশনের কথা বললাম । তারপর তাকে বললাম যে, গুলশান-বনানী এলাকায় গেলে দেখবেন অনেক আধুনিক ভবনের সামনে Simple Tree বা Space Zero বা Volume Zero লেখা আছে ; এগুলো সব কেবল ফয়েজ ভাইয়ের ডিজাইনই করা না ; বরং এগুলোর কোনোটা উনি ডেভেলপার হিসেবে বানিয়েছেন, কোনোটা আবার কনস্ট্রাকশন ম্যানেজমেন্ট পার্টনার হিসেবে বানিয়েছেন । পাগলায় তো কনস্ট্রাকশন ম্যানেজমেন্ট পার্টনারশিপ বোঝে না, ওই বিষয়টা তাকে অনেক কস্ট করে বোঝাতে হলো ।
এরপর মহাজনে কয়, আর কে আছে নামকরা সেইডা কন ; আবার আগের মতোই পাশে বসা তাদের এমডি, ডিরেক্টরকে প্রচন্ড ধমকের সুরে বললেন, 'ল্যাখো মিয়ারা ভাল কইরা, নামের বানানে যেনো ভুল না হয়' ।
এইবার আমি বলা শুরু করলাম রফিক আজম ভাইয়ের কথা । বললাম, আপনি যদি সাম্প্রতিক সময়ে এয়ারপোর্ট রোড দিয়ে এয়ারপোর্টের দিকে গিয়ে থাকেন, তাহলে দেখবেন কাকলি বাসস্ট্যান্ড পার হওয়ার পরে বনানী কবরস্থান রোডের কোনায় হাতের ডানদিকে একটা বিলবোর্ডে আপনার বিল্ডিং যে ডঃ বসুনিয়া স্ট্রাকচারাল ডিজাইন করেছেন, উনার সাথে আরেকজনের ছবি দেওয়া আছে, উনিই আর্কিটেক্ট রফিক আজম । এরপর আমার মোবাইলে রফিক আজম ভাইয়ের ফটো বের করে দেখালাম, এরপর উনার ডিজাইনের স্পেশালাইজেশনের উপর কিছু কথা বললাম । মহাজন কান পেতে রইলেন আর তার সভাসদবর্গের দিকে চোখ রাঙিয়ে পরখ করলেন, তারা সব ঠিকঠাকমতো লিপিবদ্ধ করছে কি-না !
মহাজনের কৌতুহল তো শেষ হয় না । এরপর আমারে জিগাইলো, আর ক্যাঠায় আছে নামকরা ? আমি বললাম, আরেকজন আছে যিনিও পলাশ ভাই এবং রফিক আজম ভাইয়ের একই ব্যাচের বন্ধু ছিলেন বুয়েটের আর্কিটেকচার ডিপার্টমেন্টে, মানে এনামুল করিম নির্ঝর ভাইয়ের কথা বলেছি আর কী ! বললাম, তবে তিনিও কিন্তু আর্কিটেকচারের পাশাপাশি পলাশ ভাইয়ের মতোই শিল্প-সাহিত্যের চর্চা করেন, তিনি মুভি বানান । মহাজনে কয়, কী কইলেন ? সিনেমা বানায় ? আমি কইলাম, হ্যাঁ সিনেমা বানান, তবে সুন্দর সুন্দর বিল্ডিংও ডিজাইন করেন ।
সবজান্তা জিগাইলো, কোথায় কী বানাইছে ? উদাহরণ হিসেবে তেজগাঁও-গুলশান লিংক রোডের লোকশেনসহ ইপিলীয়ন গ্রুপের বিল্ডিং নীনাকাব্যর কথা বললাম । মহাজন আবারও ধমক দিয়ে তার সভাসদবর্গকে ঠিকঠাকমতো সব লিখে রাখতে বললেন ।
অনেকে বলতে পারেন, আমাদের সিনিয়র/জুনিয়র ভাই/বোন, বন্ধু আরও অনেক আর্কিটেক্টও তো আছেন যারা ভালো কাজ করেন । আমি কেনো শুধু ওই ৪ জনের কথা বললাম ? বলেছি এই কারনে যে, ওই ৪ জনের কাছে গিয়ে মহাজন তার আদবকায়দাবিহীন সবজান্তা শমসের টাইপের কথাবার্তা বলা শুরু করলেই উনারা তাকে অর্ধচন্দ্র দিয়ে বিদায় না করলেও পত্রপাঠ বিদায় করবেন ।
ওই যে মহাজনমশাই পলাশ ভাইয়ের কথা শুনে বলেছিল, হেতায় তো ভাবের লোক । বাকি ৩ জনের একজন হ্যান্ডসাম স্মাইলিং সুদর্শন, একজন অতি ইনোসেন্ট সোবার লুকের, আর একজন একটু ড্যাশিং চঞ্চল(পজিটিভ অর্থে চঞ্চল শব্দটি ব্যবহার করেছি) স্বভাবের সিনেমাটোগ্রাফির মানুষ হলেও (যদিও পলাশ ভাইয়ের মতো উনার ঝাঁকড়া চুল নাই) উনারা কেউই আমার মতো এত নগন্য নন যে, মহাজনের কান ঝালাপালা করা ওই লেভেলের বাচাল, সবজান্তা টাইপের আইনস্টাইন মার্কা কথা পছন্দ করবেন । আর তিনি তাদের কাছে পাত্তা না পেয়ে ফিরে আসবেন এই ভেবে যে, উনারাও পলাশ ভাইয়ের মতোই ভাবের লোক ।
আর আমি যদি তরুণ কারও নাম বলতাম কিংবা সিনিয়র এমন কারো নাম বলতাম যাঁরা ওই বাচাল মহাজনের কথার ফাঁদে পড়ে কাজ শুরু করতেন, কিন্তু কিছুদিন কাজ করে এরপরে তার অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে চলে আসতেন, তাহলে তাঁদের ক্ষতি হতো, পেশাগত জীবনের মূল্যবান সময় থেকে বেশ কিছুটা সময় নষ্ট হতো ; আবার যতটুকু কাজ করবেন তার জন্য ঠিকমতো সম্মানিও পাবেন না ।
তবে তাদের মধ্যে কেউ যদি আর্কিটেক্টের পাশাপাশি গল্পকার বা উপন্যাসিক হতেন, তাহলে তাকে রেফার করতে পারতাম । তিনি তাঁর অতিবাচালমার্কা সবজান্তা টাইপের কথাবার্তার অত্যাচার সহ্য করে তার সাথে কাজ করে শেষ পর্যন্ত যথাযথ সম্মানি না পেলেও তাকে নিয়ে হুমায়ুন আহমেদ এর 'হিমু' বা 'মিসির আলী' এর মতো একটা ক্যারেক্টার তৈরি করে গল্প বা উপন্যাস লিখতে পারতেন । ওটাও একটা অর্জন হতো ।
পাদটীকা :
প্রশ্ন আসতে পারে যে, বসুনিয়া স্যার তার প্রকল্পে কীভাবে কাজ করলেন ? আমার মনে হয়, তথাকথিত কোনো আর্কিটেক্ট বা কোনো ইন্জিনিয়ার তার কাছ থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত হয়ে বসুনিয়া স্যারের দ্বারস্থ হয়ে স্যারকে আর্কিটেকচারাল ডিজাইন, সয়েল টেস্টের রেজাল্টসহ আনুষঙ্গিক প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র দেখিয়ে উনার কাছ থেকে ডিজাইন করে এনে দিয়েছে । কারন, ওই লেভেলের কথাবার্তা স্যারের সামনে বাচাল মহাজন নিজে গিয়ে ২ মিনিট বললেই তাকে স্যার ধমকিয়ে কক্ষ থেকে বের করে দিতেন বলে আমার বিশ্বাস ।
- শেফীন
(আনোয়ার পারভেজ শেফীন)
বুয়েট '৯২ ব্যাচ (এইচএসসি '৯২)
চেয়ারম্যান, পাওয়ারব্রীজ গ্রুপ