01/14/2026
সুজিত কুসুম পাল এর 'ইয়েটসের কবিতায়
নারী ও নিকুঞ্জ' নিয়ে অঞ্জন ও বেলার পাঠ প্রতিক্রিয়া
ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা Bangla Kagoj
শুভ নববর্ষ। অনেকদিন পর আচমকা বেলার ফোন। প্রতি উত্তরে অঞ্জন শুভ নববর্ষ বলার আগেই বেলার কথার ফুলকি ছুটতে থাকে । কি করছো। তেমন কিছু নয়, একটা বই পড়ছি। আহ , আবার বই। অঞ্জন বেলাকে একটু কৌতূহলী করবার জন্য শুধু এটুকু বলে , তৃতীয় বারের মতো পড়ছি। সত্যিই বেলা এবার আগ্রহ দেখায় । বোলো , বোলো , ঝটপট বলে ফেলো। সুজিত কুসুম পাল এর 'ইয়েটসের কবিতায় নারী ও নিকুঞ্জ'। এবার বেলার মনে পড়ে , অঞ্জন এই বইয়ের কথা আগেও বলেছিলো। তো বোলো , কি এমন ব্যাপার। অঞ্জন বলে , যদি শোনো , তাহলে তোমাকে একটু পাঠ প্রতিক্রিয়া জানাতে পারি , আমি তো আর ক্রিটিক নই যে, সাহিত্য সমালোচনা করবো বা করবার যোগ্যতা আছে , কিন্তু সাধারণ পাঠক হিসেবে আমার কেমন লেগেছে , সেটুকু বলতে পারি। অঞ্জন বুঝতে পারে , বেলা চুপ করে শুনছে। এই সুযোগে অঞ্জন বলে ফেলে , সুজিত কুসুম পাল এর আসলে এটা প্রথম বই , কিন্তু এই প্রথম বইয়েই বাজিমাত। মনে পড়ে , অনেক আগে যখন অরুন্ধতী রায় এর প্রথম বই নিয়ে তোলপাড় পড়ে গেছিলো? প্রথম বই , দ্য গড অফ স্মল থিংস , কিন্তু প্রথম বই লিখে বুকার জিতে নিয়েছিলেন। আসলে ফান করছি না , সিরিয়াসলি বলছি। যেমন সুজিত এর এই বই এখন শুনেছি মাস্টার্স এর শিক্ষার্থীরা রেফারেন্স হিসেবে পড়েন। আসলে কি জানো , ইয়েটস এর নাম শুনেছি , কিন্তু কখনো পড়ি নি কিন্তু সুজিত এর লেখা পড়ে একটা ঘোর লাগা পেয়ে যায় আমারও। প্রথমেই যেটা মনে হয়েছে , উনি ইয়েটস কে নিয়ে উপন্যাস লিখেছেন। এমনভাবে ঘটনা পরম্পরা সাজিয়েছেন , যে কারো মনে হতে পারে , এটা ইয়েটস এর জীবনকে নিয়ে লেখা উপন্যাস। সুনীলের সেই সময় বা প্রথম আলো সিরিজের সেই বইগুলো যেমন ইতিহাস নির্ভর কিন্তু ফিকশন , সুজিত এর নারী ও নিকুঞ্জ ফিকশন নয়। কিন্তু উনার লেখার শৈলীতে এটা ফিকশনই মনে হয়। তিনি এই বিষয়টা পরিষ্কার করে দেয়াতে এটা যে ফিকশন নয় , সেটা নিশ্চিত হই । বেলা হঠাৎ কৌতূহলী হয়ে প্রশ্ন করে , কি বললেন তিনি । উনি অন্তর্গত কথা নামে যে ভূমিকা লিখেছেন , তাতে লিখেন , ' গ্রন্থের বিষয়বস্তু কবিতাকেন্দ্রিক হলেও ব্যক্তি ইয়েটসের খন্ড খন্ড জীবনের অখণ্ড প্রতিমা উদ্ভাসিত হয়েছে তাঁরই সৃজিত কাব্যিক চেতনার রঙে। ' এরপরে বই যে আর ইয়েটস এর কল্পকাহিনী নয়, সেটা বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়।
সুজিত এর লেখা যে একদম ঝরঝরে , একটানা পড়ে ফেলা যাবে , তা নয়। আমি উনাকে বলি, লেখকদের লেখক। এই বই লিখতে গিয়ে উনি বই, আর্টিকেল মিলিয়ে একশোটা রেফারেন্স দিয়েছেন। ভাবতে পারো , কিরকম গবেষণার ফসল এই বই , লিখেছেন দুশো সাত পৃষ্ঠা কিন্তু ঠাসবুনোন একেবারে। অনুবাদ করতে গিয়ে পাঠকদের এমন সব বাংলা শব্দের সাথে পরিচয় করিয়েছেন , পড়ে মনে হয় , তাই তো , এর চেয়ে ভালো আর কি শব্দ হতে পারতো। কেমন? বেলা এবার জিজ্ঞেস না করে পারে না। যেমন ধরো , ইংলিশ শব্দ হচ্ছে MUSE কিন্তু অনুবাদ করে লিখেছেন কাব্যলক্ষী বা কলালক্ষী। বেলা ঠিক বুঝতে পেরেছে বলে মনে হয় না , অঞ্জন তাই একটু খোলাসা করার চেষ্টা করে । ইয়েটস এর জীবনীকার এর বরাত দিয়ে বলে , 'ইয়েটস এর জীবনে অনেক চমকপ্রদ নারী এসেছেন , ওঁরাই তাঁকে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন , এই চমকপ্রদ নারীরা ছিলেন তাঁর সঞ্জীবনী সুধার মতো , কবিকে অনুপ্রেরণা যোগাতেন'। ইংরেজিতে এটা ছিল MUSE , সুজিতদার হাতে চমৎকার হয়ে নতুন শব্দ তৈরী হয় কাব্যলক্ষী।
তোমাকে আরেকটা ছোট্ট অনুবাদ শোনাই - ইয়েটস এর কবিতা He Wishes For The Clothes of Heaven শেষের দুটো লাইন ছিল এরকম ' I have spread my dreams under your feet ; Tread softly because you tread on my dreams' সুজিত অনুবাদ করেন , 'তাই আজ স্বপ্নটুকুই দিলাম পেতে তোমারই চরণ তলে ; আমি জানি, ধীর লয়ে আসবে তুমি আমারই স্বপ্নকে মাড়িয়ে শুধু আমার এবং আমারই র'বে বলে'।
বোর ফিল করছো না তো। তোমার শব্দ তো নেই ই , নিশ্বাসও শুনতে পাচ্ছি না। অন্য প্রান্ত থেকে বেলার এবার সরব উত্তর , 'আমি তো মগ্ন হয়ে শুনছি তোমার কথা। তুমি বলে চলো , বইয়ের পাতায় পাতায় আর কি পেয়েছো'। অদ্ভুত একটা ব্যাপার সুজিতের বই পড়ে জানতে পারি , মড গন নামে এক আইরিশ তরুণীর প্রেমে , অনুপ্রেরণায় ইয়েটস দীর্ঘ পঞ্চাশ বছর কবিতা চর্চা করে গেছেন। আসলে প্রেমের যে সহজাত পরিণতি , সেটা হয় নি তাঁদের মধ্যে, কিন্তু এই কাব্যলক্ষী ছিলেন দীর্ঘ পাঁচ দশক কবির মানসপটে , কখনো গোচরে , বেশিরভাগ সময় অগোচরে। ইয়েটসের কবিতায় তিনি হয়ে উঠেন মিথের প্রতীক, আয়ারল্যান্ডের স্বাধীনতার প্রতীক, আবার একই সঙ্গে এক দূরবর্তী দেবীর প্রতিরূপ। ফলে বইটা পড়ে যেটা বুঝতে পারি ,ইয়েটসের কবিতায় নারীকে আমরা একদিকে খুব কাছের মানুষ হিসেবে পাই, আবার অন্যদিকে অপ্রাপ্য ও অলৌকিক রূপে দেখি।
বেশিক্ষণ কথা না বলে থাকাটা বেলার স্বভাবে নেই। এবার ও জানতে চায় , আচ্ছা , নারী তো বুঝলাম। নিকুন্জ কেন বইয়ের শিরোনামে।
অঞ্জন ভাবে , এবার একটু গুরুগম্ভীর আলোচনা না করলেই নয়। তাই বেশ সতর্কতা নিয়ে বলে , নারী ইয়েটসের কবিতায় কখনও প্রেমিকা, কখনও কাব্যলক্ষী , আবার কখনও জাতীয়বাদের প্রতীক; আর নিকুঞ্জ বলতে হয়তো সেই অন্তরঙ্গ আঙিনা, যেখানে কবি একা বসে নিজের ভাবনা সাজাতেন কখনও প্রকৃতির মধ্যে, কখনও স্মৃতির ভেতর, কখনও বা পুরনো বাড়ি ও টাওয়ারে। অঞ্জন বলে বটে , কিন্তু লেখকের এই ব্যাপারে নিজের একটা যুৎসই উদ্ধৃতি পেলে ভালো হতো। অঞ্জন আরেকটু সহজ করবার জন্য বলে , নারী আর নিকুঞ্জ তো আদতে একই , দুটোতেই কবি বসত করেছেন।
অঞ্জন ভুলেই যায় , বেলা ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়েছে। মনে পড়তেই জিজ্ঞেস না করে পারে না , তুমি কি আইরিশ লিটারারি সোসাইটি নিয়ে কিছু জানো ? বেলার পাল্টা প্রশ্ন , তুমি কি জানো , সেটা আগে শুনি। অঞ্জন সুজিত কুসুম পাল যা লিখেছেন , সেখান থেকে বেলাকে খানিকটা বলে । 'উনিশ শতকের শেষ দিকে Hermetic Order of the Golden Dawn, আর আয়ারল্যান্ডের Irish Literary Society উইলিয়াম বাটলার ইয়েটস ও মড গনের চিন্তা, বিশ্বাস এবং শিল্পীসত্তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। ইউরোপ জুড়ে তখন এক ধরনের আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণ চলছিল । Hermetic Order of the Golden Dawn ছিল একটি গোপন আধ্যাত্মিক সংগঠন, যেখানে সদস্যরা জাদুবিদ্যা , পুনর্জন্ম , অতিপ্রাকৃত ইত্যাদি নিয়ে সাধনা করতেন। ইয়েটস এই সংগঠনের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং নিয়মিত আচার–অনুশীলনে অংশ নিতেন'।
অঞ্জন বেলাকে জিজ্ঞেস করে , এই বিষয়গুলো নিয়ে তুমি কী জানো। বেলা বলে , এই সংগঠন ইয়েটসকে শিখিয়েছিল দৃশ্যমান জগতের বাইরে আরও এক রহস্যময় জগৎ আছে, যেখানে প্রতীক ও আচার দিয়ে সত্যকে ধরা যায়। এর প্রভাব সরাসরি দেখা যায় তাঁর কবিতায়। ইয়েটসের বহু কবিতায় যে ঘূর্ণি, দেবদূত, ভবিষ্যদ্বাণী ও সময়চক্রের ভাবনা দেখা যায় তার পেছনে গোল্ডেন ডনের প্রতীকী দর্শন কাজ করেছে। The Second Coming–এর “gyre” বা A Vision–এর সময়চক্র ধারণা গোল্ডেন ডন থেকেই এসেছে । অঞ্জন বলে , মড গন ও এই সংগঠনে আকৃষ্ট ছিলেন। সুজিত গবেষণা করে দেখিয়েছেন , মড গনের দ্বিতীয়বার সন্তান ধারণের আকাংখা আগের মৃত সন্তানের আত্মা ফিরে পাবার এক অলৌকিক বিশ্বাস থেকেই জন্ম নেয়া। মড গন বিশ্বাস করেন, আগের মৃত সন্তান জর্জির কফিনের পাশে নবজাতক ইসল্ট গণের জন্মের মধ্য দিয়ে জর্জির আত্মাই ফিরে এসেছে।
এবার বেলা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে অঞ্জনের কাছে জানতে চায় , সুজিত কুসুম পাল কি দ্য টাওয়ার কবিতার কথা বলেছেন। অঞ্জনের মনে পড়ে , আর বইটা ও হাতের কাছে ছিল , বলে , এটা নিয়ে তো উনি বেশ ভালো একটা আলাপ করেছেন , শিরোনামটি ও বেশ আকর্ষণ করবার মতো। বেলা জানতে চায় , যেমন ? পাশ্চাত্য ক্যানভাসে প্রাচ্যের পুনর্জন্ম। বেলার সপ্রতিভ উত্তর , বেশ চমৎকার তো। তো উনি কি লিখলেন ?
ভারতীয় পুরাণের প্রতিও ইয়েটস এর আগ্রহ ছিল। তাঁর কবিতায় ভারতীয় তান্ত্রিক পুরাণের প্রভাব রয়েছে। অঞ্জন বেলাকে জিজ্ঞেস করে , দ্য টাওয়ার নিয়ে তুমি কী জানো।
'আয়ারল্যান্ডের বালিলি নামের স্থানে অবস্থিত একটি পুরনো টাওয়ারে বসবাস করার সময় ইয়েটস এই কবিতাগুলো লেখেন। সুজিত কুসুম পাল ঠিকই লিখেছেন, ইয়েটসের কবিতায় এক আশ্চর্য বিষয় লক্ষ করা যায় পশ্চিমা কাঠামোর ভেতরে প্রাচ্যের দর্শনের পুনরাবির্ভাব। পুনর্জন্ম বা reincarnation–এর ধারণা মূলত প্রাচ্য দর্শনের সঙ্গে যুক্ত। হিন্দু ও বৌদ্ধ চিন্তায় জীবন কোনো একক রেখা নয়; বরং এটি এক চক্র, যেখানে জন্ম, মৃত্যু ও পুনর্জন্ম বারবার ফিরে আসে। ইয়েটস এই ধারণাকে সরাসরি গ্রহণ না করলেও, তাঁর কবিতায় এটি নতুন রূপে হাজির হয়।
তবে ইয়েটস প্রাচ্যের দর্শনকে অনুকরণ করেননি; বরং সেটিকে পশ্চিমা ইতিহাস, আইরিশ অভিজ্ঞতা ও ব্যক্তিগত জীবনের সঙ্গে মিশিয়ে এক নতুন শিল্পরূপ তৈরি করেছেন'।
এবার অঞ্জনের পালা - বেশ শক্ত ধারণা মনে হচ্ছে। আমি তো সাহিত্যের ছাত্র নই , তাই এই বিষয়গুলো আরো গভীরে বুঝতে পারলে ভালো হতো। তবে সুজিত রবীন্দ্রনাথ , মোহিনী চ্যাটার্জি এবং শ্রী পুরোহিত স্বামীর কথা লিখেছেন । এটা তো আমরা জানি ,১৯১২ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ইংরেজি অনুবাদ করা কবিতাগুচ্ছ Gitanjali ইয়েটসের হাতে আসে। ইয়েটস এই কবিতায় গভীরভাবে মুগ্ধ হন। তিনি শুধু কবিতাগুলো পড়েননি, বরং বইটির ভূমিকা লিখে দেন যা গীতাঞ্জলিকে পশ্চিমা পাঠকের কাছে পৌঁছে দিতে বড় ভূমিকা রাখে। বেলা এবার যোগ করে , মোহিনী চট্টোপাধ্যায় ছিলেন ইয়েটসের জীবনে সবচেয়ে প্রভাবশালী ভারতীয় চিন্তাবিদ। তিনি ছিলেন থিওসফিক্যাল সোসাইটির সদস্য এবং ভারতীয় দর্শনের একজন গভীর বক্তা। ইয়েটস তাঁর বক্তৃতা শুনে প্রথমবারের মতো পুনর্জন্ম ধারণার সঙ্গে পরিচিত হন।
সুজিত ও এই প্রসঙ্গে Sailing to Byzantium এর কথা উল্লেখ করেন। শ্রী পুরোহিত স্বামীর সঙ্গে ইয়েটসের সম্পর্ক নিয়ে সুজিত তেমন কিছু লিখেন নি। অঞ্জন বেলাকে জিজ্ঞেস করে , তোমার কি কিছু জানা আছে ? বেলা বলে, সেরকম বিশদ কিছু জানি না তবে পুরোহিত স্বামী ছিলেন একজন হিন্দু সন্ন্যাসী, যিনি দীর্ঘদিন ইউরোপে বসবাস করতেন। ইয়েটস তাঁর সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন এবং একসঙ্গে কাজও করেন।
বেলার এবার তাড়া , অনেক সাহিত্য আড্ডা হলো , যেতে হবে মশাই। ওহো , তাই তো , অনেকক্ষন তোমাকে আটকে রেখেছি। পরে আবার অন্য কোনো দিন।
দুদিন পার হয়ে গেলো। আবার বেলার ফোন। সেদিন তো বইয়ের কিছু অংশ বাকি রয়ে গেলো। পুরো বইয়ে তোমার মুগ্ধতার জায়গা কোনটা , সেটা জানা হলো না। অঞ্জন নিজেই মুখ টিপে হাসে , ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে বেলা যাতে বুঝতে না পারে। বেলাকে নিয়ে এই এক ব্যাপার , কোনো একটা ব্যাপারে ওর আগ্রহ ঢুকে গেলে ওটার পুরোটা না জেনে ছাড়বে না। অঞ্জন বুঝতে পারে , বইয়ের আদ্যোপান্ত না জেনে ও ছাড়ছে না। তাই কানে ফোনটা ধরে অঞ্জন বইটা হাতে নিয়ে আবার উল্টাতে শুরু করে । ওর মনে পড়ে যায় , সেই বিখ্যাত কবিতা ইস্টার ১৯১৬ নিয়ে সুজিত পুরো একটা চ্যাপ্টার লিখেছেন। বেলাকে বলতেই বেলা সেই কবিতার কয়েকটি চরণ গুনগুনিয়ে উঠে - Too long a sacrifice, Can make a stone of the heart., O when may it suffice? অঞ্জন ভেবে পায় না , এ কি ব্যাপার। বেলা ও কি অতিপ্রাকৃত হয়ে গেলো নাকি। না হলে সুজিত এর বইয়ে এই চরণগুলোর উদ্ধৃতি তো আছে , ইস্টার কবিতায় আশিটা লাইন আছে। ঠিক ধরে ধরে এই লাইন তিনটি কিভাবে বেলা বললো। বেলাকে এই কথা বলতেই বেলা এবার না খুঁচিয়ে ছাড়ে না - আরে মশাই , 'Great Men think alike ' অঞ্জন ও পাল্টা বলে ওঠে , তুমি কি তাহলে ম্যান এর কাতারে চলে আসলে । অঞ্জন ভাবে , এই কবিতাটি নিয়ে বেলার কাছ থেকে ওর মতামত শুনে নিলে মন্দ হয় না। বেলাকে জিজ্ঞেস করতেই বলে ওঠে , এই কবিতা আসলে আইরিশ বিদ্রোহে নিহত নেতাদের আত্মত্যাগ নিয়ে লেখা । কীভাবে শহীদেরা সাধারণ মানুষ থেকে ইতিহাসের প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে , যাদের কারণে আইরিশ জাতির ইতিহাসে ঘটে গেছে এক গভীর ও স্থায়ী পরিবর্তন - ইয়েটস যেটিকে বলেছেন A terrible beauty is born.
অঞ্জন বলে , সুজিত কিন্তু এই বইয়ে একটা ভিন্নতর কাজ করেছেন। শুধু ইয়েটস এর কবিতার বিশ্লেষণে থেমে থাকেন নি , উনি আমাদের বাংলা কবিতার প্রাণপুরুষ শামসুর রাহমান এর 'তোমাকে পাওয়ার জন্য হে স্বাধীনতা' কবিতার সাথে একটা তুলনামূলক আলোচনা করেছেন। ইস্টার ১৯১৬ কবিতায় আইরিশ বিপ্লব নিয়ে ইয়েটস এর দ্বিধা দ্বন্ধ ছিল , কিন্তু শামসুর রাহমান এর সেটা ছিল না। সুজিত বলেছেন , ব্রিটিশদের প্রতি ইয়েটস এর আপোষকামিতা প্রকাশ পেয়েছে যখন বললেন , they dreamed and are dead ...কিন্তু শামসুর রাহমান পাকিস্তান সরকারের প্রতি তার ক্ষিপ্ততা দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছিলেন - 'শহরের বুকে জলপাইয়ের রঙের ট্যাঙ্ক এলো, দানবের মত চিৎকার করতে করতে, তুমি আসবে বলে, হে স্বাধীনতা'। সুজিত এর বই থেকে জানতে পারি , ইয়েটস এর এই কবিতা এতো বিখ্যাত কিন্তু তাঁর কাব্যলক্ষী মড গন এটি পছন্দ করেন নি , বরং প্রত্যাখ্যান করেছেন।
অঞ্জন মনে মনে ভাবে , বেলাকে এই করে পুরো বইয়ের সিনোপসিস দেয়া হয়ে যাচ্ছে , বইটি নিয়ে ওর আগ্রহ কে স্পয়েল করার কোনো মানে হয় না। বেলা, তুমি ইংরেজি সাহিত্য নিয়ে পড়েছো , এই বইটা পড়ে দেখো , ভালো লাগবে। ইয়েটস নিয়ে তোমার ও বেশ পড়াশোনা , অন্তত কিছু কবিতা তো পড়েই এসছো , তাছাড়া ইয়েটস আর রবীন্দ্রনাথ নিয়ে সুজিত এর কিছু পর্যবেক্ষণ আছে , আমি বলবো বেশ নতুন , আগে কেউ এভাবে লিখেছেন কিনা জানি না। বেলা কৌতূহলী হয়ে ওঠে , যেমন?
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ও ডব্লিউ. বি. ইয়েটস দুজনেই আধুনিক যুগের মহান কবি, তাঁদের দুজনের প্রেরণার উৎসই ছিল সুজিত এর ভাষায় কাব্যলক্ষীরা । সুজিত দেখিয়েছেন , যে নারীকূল এই দুজন মহান কবির সান্নিধ্যে এসেছেন, আজীবন এই দুই কবির সাথে তাদের বন্ধুত্ব অটুট রয়ে গিয়েছিল । ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো কে নিয়ে রবীন্দ্রনাথের সম্পর্কের একটা নতুন বিষয় জানতে পাই , আর্জেন্টিনায় ওকাম্পোর বাড়িতে কবি যে চেয়ারে বসে কাব্য রচনা করতেন , সেই চেয়ার ওকাম্পো তাকে উপহার হিসেবে জাহাজে তুলে দিয়েছিলেন। ইয়েটসকে নিয়ে লিখতে গিয়ে সুজিত কুসুম পাল রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে ও বেশ গবেষণা করেছেন , বোঝা যায়। ফোনের অন্য প্রান্তে বেলা এবার সপ্রতিভ হয়ে ওঠে , আমার কিন্তু একটু ভিন্ন পর্যবেক্ষণ আছে। যেমন, রবীন্দ্রনাথের বেলায় নারী, যেমন কাদম্বরী দেবী বা ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো, গুরুত্বপূর্ণ হলে ও তারা কখনোই একমাত্র প্রেরণা হয়ে উঠেন নি। রবীন্দ্রনাথের প্রেরণা ছিল প্রকৃতি , মানবতা এবং ঈশ্বরচেতনা। তাঁর কবিতায় নারী সাধারণত প্রেমের সহযাত্রী , অন্তরঙ্গ সঙ্গী বা দূরবর্তী দেবী নন। অন্যদিকে ইয়েটস ছিলেন ভিন্নরকম। ইয়েটসের কাব্যলক্ষী ছিলেন প্রধানত একজন নারী মড গন। তিনি ইয়েটসের জীবনে ছিলেন অপ্রাপ্য প্রেমিকা, রাজনৈতিক কর্মী এবং আয়ারল্যান্ডের প্রতীক। ইয়েটসের কবিতায় মড গন ধীরে ধীরে বাস্তব নারী থেকে রূপান্তরিত হন দেবী, মিথ ও জাতির প্রতিমূর্তিতে। তাঁর কবিতায় কাব্যলক্ষী প্রায়ই দূরবর্তী কেউ , কঠোর ও আদর্শে দৃঢ় , হয়তো সেকারণেই সেই নারীর প্রতি আকর্ষণ যেমন গভীর, তেমনি বেদনাময়। আরও একটি মৌলিক পার্থক্য হলো, ইয়েটসের মিউজ তাঁকে টেনে নেয় সংঘাত, রাজনীতি ও ট্র্যাজেডির দিকে আর রবীন্দ্রনাথের মিউজ তাঁকে নিয়ে যায় সমন্বয়, শান্তি ও মানবিক পূর্ণতার দিকে।
বাহ্ , সুন্দর পর্যবেক্ষণ , অঞ্জন না বলে পারে না। সুজিত কুসুম পাল এর এই বইয়ের আরেক বিষয় লক্ষ্য করেছি , তিনি বইয়ের শেষে বেশ সুন্দর একটা এলবাম জুড়ে দিয়েছেন। তাতে ইয়েটস , মড গন এবং কবির বাড়ি , আরো কিছু কবিবন্ধুর ছবি রয়েছে।
আচ্ছা আজ আর নয়। এই বইয়ের সবই তোমাকে জানিয়ে দিলাম , বেলা। আমি চাই , তুমি ও বইটি পড়ো এবং তোমার পর্যবেক্ষণ জানাও। আমি গত দুই বছর ধরে বেড সাইড টেবিলে অন্য বইয়ের সাথে এই বইটি রেখেছি। শুরুতে বেশ জটিল মনে হতো কিন্তু রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন না, কঠিনেরে ভালবাসিলাম। আমিও কঠিন সেই ভালোবাসা থেকে প্রায়ই বইটি হাতে তুলে নিয়ে পড়তাম কিন্তু কিছুতেই পাঠ প্রতিক্রিয়া লিখে উঠতে পারছিলাম না। এবার সাহস করেই ভাবলাম , তোমার সাথে বইটি নিয়ে আলাপ করি আর দেখো , সেই আলাপেই বের হয়ে আসলো বইটি নিয়ে আমার যাবতীয় অনুভূতি।
বইটি পড়বার পর তোমার কেমন লেগেছে, জানিয়ো । অঞ্জনের কথা শুনতে শুনতে বেলা ভাবে , সুজিত এর 'ইয়েটসের কবিতায় নারী ও নিকুঞ্জ ' নিয়ে অঞ্জন বেশ মজেছে কিন্তু মুখে শুধু এটুকু বলে, জানাবো , এবার রাখি ।
মনীষ পাল লেখক ও অভিবাসন উপদেষ্টা