28/08/2026
" #স্মৃতির_নদীতে_আমার_এই_নীলচে_আকাশ ! "
লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর থেকে নামার সেই ২০০৫ সালের দিনটার কথা আজও চোখের সামনে ভাসে। তখন আমার বয়স কম, বুকভরা স্বপ্ন আর চোখে ছিল এক আকাশসম প্রত্যাশা। নতুন একটা দেশ, অচেনা চারিপাশ—সব মিলিয়ে এক রোমাঞ্চকর জীবন শুরু হয়েছিল। দেখতে দেখতে কেটে গিয়েছিলো ২০১২ সাল পর্যন্ত। পড়াশোনা শেষ করলাম, বিদেশের মাটিতে নিজেকে গড়ে তুললাম। বৃটেন কিংবা ইউরোপে থেকে গেলেও থেকে যেতে পারতাম অনায়াসে। গ্রেট ব্রিটেনে যাঁদের সঙ্গে কাটিয়েছি ৭টি বছর, তাঁরা কেউ কেউ অনেক বড় বড় কর্পোরেট হয়েছেন, ব্যবসায়ী হয়েছেন, নামী দামী বাড়ী গাড়ির মালিক হয়েছেন, এতে কখনোই আমার এতো টুকু দীর্ঘশ্বাস হয়নি বরং গর্বিত হয়েছি। কিন্তু শেকড়ের টান কি সহজে এড়ানো যায়?
তাইতো সব ছেড়ে ছুড়ে একসময় ফিরে গেলাম প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে। আমার সেই মেঠো পথে, যেইখানে বাড়ীর বারান্দায় দাঁড়িয়ে বাবার বানানো ফুলবাগানে দূর্বাঘাস এ সিলভার রঙের শিশিরবিন্দু দেখা যায়, শিথলে পড়া সেই সিরিপুকুর পারে বসে আমলকী গাছের বাসা বাঁধা টুনটুনির টুং টুং ডাক শোনা যায়!
দেশে ফিরে শুরু হলো জীবনের আরেক অধ্যায়। সংসার শুরু করলাম, কয়েকটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে বেশ ভালো ভালো পদেই চাকরি করলাম। ঢাকার কোলাহল, বন্ধুদের আড্ডা, আর প্রতিদিনের পরিচিত ব্যস্ততা—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল জীবন তার পূর্ণতা পেয়েছে। আমার ঘর জুড়ে এলো ছেলে মেয়ে দুটি- রৌদ্রি এবং রাদিত। দিনশেষে সমস্ত ব্যস্ততা পেড়িয়ে যখন ঘরে ফিরে যেতাম তখন ওদের দেখে আমি আমার বিশ্ব মানচিত্র খুঁজে পেতাম, এখনও তাই ই পাই।
আসলে মানুষের জীবন যে কখনোই পূর্ণতা পায় না, ঠিক তাই ! ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস! ২০২০ সালে আব্বা, ২০২১ এ ছোট্ট ভাইটি 'প্রিন্স' কে আমার বুকের দুপাশ থেকে দুজন কে রাব্বুল আলামিন নিয়ে গেলো নীল আকাশে ! যেইখানে আকাশের উপরে আকাশ, মেঘের উপরে মেঘ !
খুব বেশী করেই খেয়াল করলাম, তারপর থেকেই কেমন করে যেনো খুব কাছের মানুষগুলো দূরে সরে যেতে লাগলো! কোনো না কোনো ভাবেই শুধুই খারাপ হতে থাকলাম তাঁদের চোখে! আমিও কোনও সুযোগ নেয়া দেয়ার আগেই সরে যেতে থাকলাম! ৩ বছর পর সত্যিই মনে হলো দূরে ই যদি যেতে হয়, যাই তবে দূরেই বা চলে ! রেভলিউশন, সিচুয়েশন, রিয়ালিটি আর আমার ছোট্ট দুইটি মানচিত্র নিয়ে বেড়িয়ে এলাম পৃথিবীর নতুন ভূখণ্ডে, অথচ যে ভূখণ্ড কখনোই আমার বা আমাদের নাহ্। ২০২৩ সালে কাজের সুবাদে এবং ভবিষ্যতের টানে আবার পাড়ি জমাতে হলো ইউরোপে—এবার গন্তব্য ডেনমার্ক, তারপর পর্তুগাল। আমার পরে মায়ের ও ভাগ্যে চলে আসতে হলো লন্ডনে বড় ভাইয়ের কাছে। শুধু শূন্য হয় থাকলো বাবার বানানো সেই গাছ গাছালি, পাখ পাখালি ভরা বাড়িটি! আমি প্রতিদিন কেমন করে যেনো কান পেতে শুনি - বাড়িটি নীরবে কাঁদে আমাদের জন্যে!
এইখানে আমার পাকাপাকি সেটেলমেন্ট হয়েছে। ইউরোপের এই পরিপাটি, শৃঙ্খলিত জীবনে কোনো অভাব নেই। নেই কোনো অনিশ্চয়তা। কিন্তু অদ্ভুত এক শূন্যতা কুঁড়ে কুঁড়ে খায় আমাকে। চারপাশের এই নিখুঁত সবুজ লন, সাইকেলের জ্যামহীন লেন আর আটলান্টিকের ঠান্ডা হাওয়া আমাকে স্পর্শ করে না। আমার মনটা সবসময় পড়ে থাকে সুদূর বাংলার কোনো এক মেঠো পথে। অফিসের বড় বড় মিটিংয়ের ফাঁকে, কিংবা পর্তুগিজদের পাথরের পাহাড়ের কোনো এক গোধূলি লগ্নে যখন বাইরে নীল মেঘগুলোকে দেখি , তখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে—বর্ষার দিনে ধানখেতের ওপর আছড়ে পড়া বৃষ্টির ফোঁটার শব্দ। গ্রামের মেঠো পথ ধুয়ে নিয়ে যাওয়া এঁকেবেঁকে চলা সেই আমার শৈশবের টলমলে জলের কুমার নদী! দুপুরের রোদে ভেজা সোঁদা মাটির তীব্র সুবাস। সন্ধ্যার আজানের ধ্বনিতে চারপাশের স্নিগ্ধ নিস্তব্ধতা। আমার সেই নদী, নালা, পথঘাট আর মাটির সেই চেনা গন্ধ আমাকে প্রতি মুহূর্তে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়ায়।
মাঝে মাঝে ভাবি, কেন এমন হয়? সব কিছু তো গুছিয়ে নেয়া যায়, তবুও এই অদ্ভুত একাকীত্ব কেন আমাদের? কিন্তু আমার আবেগী দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুঝিয়ে দেয় জীবন তো আসলে এক বহমান নদীর নাম, যার পথ সবসময় নিজের ইচ্ছায় চলে না।
আমি খুব কথা বলতে ভালোবাসি। পৃথিবীর যত দেশেই থেকেছি, যতো দেশেই কাজ করেছি, সবার সাথেই আমার খুব ভালো বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছে। আমার এক সার্বিয়ান সহকর্মী একবার আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলো, তুমি কোন দেশে থাকতে প্রেফার করো? মনে আছে, আমি বলেছিলাম পৃথিবীর কোন দেশ কতো উন্নত সেটা আমার প্রেফারেবল না, পৃথিবীর কোন জায়গায় আমি হ্যাপি ফিল করি, সেইটাই আমার রিয়েল প্লেস।
আমাদের এই টেম্পোরারি ডামি কমলালেবু পৃথিবীতে ভালোমতো হাসতে পারা, প্রাণখুলে কথা বলতে পারা বরই প্রয়োজন সবার।
কবি জীবনানন্দ দাশের একটা লাইন আমার খুব প্রিয় - " যে জীবন ফড়িংয়ের, দোয়েলের, মানুষের সাথে তাঁর হয়নাকো দেখা"
পৃথিবীর সমস্ত মানুষ ভালো থাকুক, প্রাণভরে কথা বলুক, প্রাণভরে হাসতে জানুক আবার, এটাই প্রত্যাশা! 🩵