10/09/2026
রেহানা প্রথম দেখসিলেন একটা শুক্রবার সকালে। কাপড় বদলাইতে গিয়া দেখলেন দাগ। মাসিকের সময় না, তার মাঝখানে। তিনি কিছুক্ষণ বইসা রইলেন। তারপর কাপড়টা নিয়া কলপাড়ে গেলেন, আর সবার আগে ওইটা ধুইয়া ফেললেন। মেয়ে তখন ঘুমাইতেসে। স্বামী বাজারে। ধুইতে ধুইতে তিনি নিজেরে কইলেন, কিছু না।
রেহানার বয়স আটত্রিশ। থাকেন একটা মফস্বল শহরে। স্বামীর একটা ছোট দোকান আছে, ছেলে ঢাকায় পড়ে, মেয়ে ক্লাস সেভেনে। তাঁর ভালো লাগে বারান্দার গাছগুলা। বারোটা টব। আর ওই বারোটার মধ্যে একটা নিয়া তাঁর আলাদা গর্ব আছে। মরিচ গাছ। বগুড়ায় বলে পৈত্যা। রেহানার বাড়ি বগুড়ায়। ওইখানকার মরিচ আলাদা জিনিস। ঝাল এমন যে চোখে পানি আসে, আর গন্ধটা এমন যে ঘরে ঢুকলেই বোঝা যায় কোন বাড়িতে পৈত্যা ভর্তা হইতেসে। খোদাতায়ালা গরিব মানুষকে কিছু জিনিস নিজের হাতে দেন। পৈত্যা ওইরকম একটা জিনিস। বগুড়ার গরিব মানুষ পৈত্যা ভর্তা আর একটু লবণ দিয়া পুরা এক থালা ভাত খায়া ফেলতে পারে। রেহানার মা বলতেন, চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের সময় তাঁরা ওইভাবেই ছিলেন। তাঁদের অবস্থা হতদরিদ্র ছিল না, তবু ওই বছরটা তাঁদেরও শিখায়া দিসিল হতদরিদ্র হওয়া কেমন। ভাত ছিল অল্প, তরকারি ছিল না, আর ওই মরিচটাই ছিল সব। রেহানা যখন বিয়ে হইয়া এই শহরে আসলেন, তখন মায়ের গাছ থেকে বীজ নিয়া আসছিলেন। আঠারো বছর ধইরা ওই গাছটা তিনি বাঁচায়ে রাখসেন। মরলে আবার লাগাইসেন, আগের গাছের বীজ থেকে। প্রতিবেশীরা চাইতে আসে। তিনি হাসতে হাসতে দেন, আর বলেন, এইটা বগুড়ার ঝাল।
আর তাঁর একটা অভ্যাস আছে। মেয়ে স্কুল থেকে ফেরার পর মা মেয়ে দুইজন মিলা এক কাপ চা ভাগ কইরা খান। মেয়েটা স্কুলের সব গল্প বলে, কোন মেয়েটা কী বলল, কোন স্যার কী করলেন। ওই আধা ঘণ্টাটা রেহানার দিনের সবচেয়ে ভালো সময়। সেই শুক্রবারের পর দুই সপ্তাহ কিছু হইল না। তিনি ভাবলেন, যাক। তারপর আবার হইল। এইবার একটু ভয় পাইলেন। কিন্তু কাকে বলবেন? মেয়েটাকে? বয়স তেরো, এইসব কথা বলা যায় না। শাশুড়িকে? তিনি তো এমনিতেই বলেন বউয়ের শরীর সবসময়েই খারাপ থাকে। তাহলে স্বামীকে। আর তাঁকে বলতে হইলে বলতে হবে যে মেলামেশার পর রক্ত যায়। এই বাক্যটা এই দেশের একজন নারী তাঁর স্বামীকে কীভাবে বলবেন? তিনি ঠিক করসিলেন বলবেন। এক রাতে ভাত বাড়তে বাড়তে ভাবলেন, আজ বলব। স্বামী ভাত খাইতে বসলেন, তারপর দোকানের হিসাবের কথা শুরু করলেন, বাকির খাতায় কে কত রাখসে। রেহানা শুনলেন। মাথা নাড়লেন। পাতে আরেক চামচ তরকারি দিলেন। কথাটা বলা হইল না। প্রায় দুই মাস পর বলা হইল। সহজে না। বাতি নেভানোর পর, অন্ধকারে, চাদরের নিচে। খুব নিচু গলায় বললেন, শোনো, একটা কথা। তারপর বললেন। লোকটা কিছুক্ষণ চুপ কইরা থাকলেন। তারপর বললেন, ও কিছু না। বয়স হইতেসে তো। তোমার মায়েরও তো এমন হইসিল, তারপর তো বন্ধ হইয়া গেল। রেহানা স্বস্তি পাইলেন। ভাবলেন, যাক, উনি তো বললেন কিছু না। আর লোকটা ওইদিন সত্যিই বিশ্বাস করসিলেন যে কিছু না। তিনি ডাক্তার না। মাসিকের মাঝখানে রক্ত যাওয়া মানে কী, ওইটা তিনি জানতেন না। এই দেশে কোনো পুরুষকে কেউ এইসব শিখায় নাই। ওইটুকুই যথেষ্ট ছিল, আরেকটা বছর পার হইয়া যাওয়ার জন্য। ওই রক্তের কারণটা শুরু হইসিল প্রায় কুড়ি বছর আগে। রেহানার বিয়ে হইসিল আঠারো বছর বয়সে। উনিশে ছেলে, বাইশে মেয়ে।
আর কোনো একটা সময়ে তাঁর শরীরে একটা ভাইরাস ঢুকসিল। নাম এইচপিভি। ছড়ায় ঘনিষ্ঠ শারীরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়া, আর ছড়াইতে শরীরের তরল বিনিময়েরও দরকার হয় না, ত্বকের সংস্পর্শেই যথেষ্ট। কিন্তু এই ভাইরাসের সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিসটা ওইটা না। সবচেয়ে ভয়ংকর জিনিসটা হইল, এইটা শরীরে ঢুইকা দশ বিশ বছর চুপ কইরা বইসা থাকতে পারে। কোনো লক্ষণ না, কোনো ব্যথা না, কিছুই না। কারও কারও শরীরে ভাইরাসটা নিজে নিজেই চইলা যায়। কারও কারও ক্ষেত্রে যায় না, থাইকা যায়। তখন জরায়ুর মুখের কোষগুলা ধীরে ধীরে বদলাইতে থাকে। তারপরে তাই থিকা হয় ক্যান্সার।
জরায়ুমুখের ক্যান্সার!!
এত ধীরে এই ক্যান্সার হয় যে সময় লাগে দশ থেকে বিশ বছর। কুড়িটা বছর। রেহানার ওই কুড়ি বছরে কী কী হইসিল? ছেলেটা স্কুলে ভর্তি হইল। মেয়েটা হাঁটতে শিখল। শ্বশুর মারা গেলেন। ঘরটা পাকা হইল, একটু একটু কইরা। বারান্দার টবগুলা একটা একটা কইরা বাড়ল। মরিচ গাছটা দুইবার মরল, দুইবারই তিনি আগের বীজ থেকে আবার লাগাইলেন। ছেলেটা ঢাকায় চান্স পাইল, ওইদিন রেহানা সারা পাড়ায় মিষ্টি বিলাইসিলেন। আর ওই পুরা সময়টা তাঁর কোনো কষ্ট ছিল না। কোনো ব্যথা না, কোনো রক্ত না, কিছুই না। তিনি সুস্থ ছিলেন।
আর ওই কুড়ি বছরের যেকোনো একটা দিনে, একটা পাঁচ মিনিটের পরীক্ষায় জিনিসটা ধরা পড়ত। তখন ওইটা ক্যান্সারই না, ক্যান্সারের আগের অবস্থা। ওই অবস্থায় সারানো যায়। এত লম্বা সময় আর কোনো ক্যান্সার মানুষকে দেয় না। রেহানা একবার গেসিলেন। তিন বছর আগের কথা। পাশের বাসার ভাবি বলসিলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মহিলাদের একটা পরীক্ষা হয়, ফ্রি।
রেহানা বাসায় বলসিলেন মেয়ের স্কুলে যাইতেসেন। গিয়া লাইনে দাঁড়াইলেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা। তারপর যখন ডাক পড়ল, তিনি ওই ঘরটার দরজার সামনে গিয়া দাঁড়াইলেন। দরজায় পর্দা আছে, কিন্তু ওইটা ছোট। দুই পাশে ফাঁক। বাইরে লোক দাঁড়ানো, পুরুষ মানুষও আছে। ভিতরে যাইতে হইলে কাপড় খুলতে হবে। তিনি সংকোচ নিয়া দাঁড়ায়া রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর ফিরা আসলেন। বাসায় আইসা রান্না চড়াইলেন। কাউকে কিছু বললেন না।
এইটা আমি বানাই নাই। ঢাকায় নারীদের উপর করা একটা গবেষণায় বাইর হইসে, তাঁরা এই পরীক্ষাটা করান না কারণ পরীক্ষার সময় গোপনীয়তা থাকে না, কারণ তাঁরা জানেনই না যে এইটা ক্যান্সারের পরীক্ষা, আর কারণ তাঁরা ভাবেন টাকা লাগবে। একটা পর্দা। একটা ভালো পর্দা লাগাইতে এই দেশে কত টাকা লাগে?
এই দেশে ত্রিশ থেকে ঊনপঞ্চাশ বছরের নারীদের মধ্যে মাত্র ৭.৫ শতাংশ কোনোদিন এই পরীক্ষাটা করাইসেন। প্রতি চোদ্দজনের মধ্যে তেরোজন কোনোদিন করান নাই। রেহানা ওই হতভাগ্য তেরোজনের একজন।
চার মাস পর তিনি ফার্মেসিতে গেলেন। দোকানে লোক দাঁড়ানো ছিল, তাই অপেক্ষা করলেন সবাই যাওয়া পর্যন্ত। তারপর নিচু গলায় বললেন, একটু বেশি রক্ত যায়। এইটুকুই বললেন। আসল কথাটা বলতে পারলেন না। দোকানদার একটা ওষুধ দিল। রেহানা ওইটা খাইলেন। কিছু হইল না।
তারপর আরও ছয় মাস। কোমরে ব্যথা শুরু হইল। মেয়ের সাথে চা খাওয়ার সময়টায় তিনি এখন আর বসতে পারেন না, শুইতে চান। মেয়েটা বলল, মা তুমি ডাক্তার দেখাও। ছেলেটা ঢাকা থেকে আসল, তারপর জোর কইরা মাকে জেলা হাসপাতালে নিয়া গেল।
ডাক্তার পরীক্ষা করলেন। তারপর অনেকক্ষণ চুপ কইরা থাকলেন। জরায়ুমুখের ক্যান্সার। ছড়ায়ে গেছে। তারপর ডাক্তার ছেলেকে বললেন কাগজগুলা নিয়া বাইরে যাইতে। রেহানাকেও বাইরে বসাইলেন। তারপর স্বামীকে বললেন, আপনি একটু বসেন। ডাক্তার বুঝায়ে বললেন। এই ক্যান্সারটা হয় একটা ভাইরাস থেকে। ভাইরাসটা ছড়ায় শারীরিক সম্পর্কের মধ্য দিয়া। শরীরে ঢুইকা পনেরো বিশ বছর চুপ কইরা থাকতে পারে, কোনো লক্ষণ থাকে না। আর পুরুষের শরীরে এইটা আছে কিনা, ওইটা বাইর করার কোনো পরীক্ষাই নাই। ডাক্তার আরও বললেন, এইখানে দোষ খোঁজার কিছু নাই। কে কার কাছ থেকে পাইসে, ওইটা কেউ কোনোদিন বাইর করতে পারবে না। ডাক্তার কথাটা ভালোভাবেই বললেন। তিনি চাইতেসিলেন লোকটা যেন স্ত্রীকে দোষ না দেন।
লোকটা শুনলেন। মাথা নাড়লেন। তারপর বাইর হইয়া করিডোরে গিয়া দাঁড়াইলেন। আর ওইখানেই দাঁড়ায়া রইলেন অনেকক্ষণ। কারণ ডাক্তার তাঁকে যেই কথাটা কইলেন, ওইটা তাঁর মাথার ভিতরে একটা বন্ধ কুঠুরির তালা খুইলা দিল।
তেরো বছর আগের একটা রাত। ঢাকায় একটা কাজে গেসিলেন, কয়েকদিন ছিলেন। একবার। মাত্র একবার। তারপর তিনি বাড়ি ফিরসেন, দোকান চালাইসেন, সন্তান মানুষ করসেন, আর ওই রাতটাকে মাথার ভিতরের একটা কুঠুরিতে ঢুকায়া তালা মাইরা দিসেন। তেরো বছর ওই তালাটা বন্ধ ছিল। আর ওইদিন করিডোরে দাঁড়ায়া তিনি জানলেন। কিন্তু ততক্ষণে সব শেষ।
এই রোগ শুরুতে ধরা পড়লে পাঁচ বছর বাঁইচা থাকার হার ৭৩.২ শতাংশ। আর দেরিতে ধরা পড়লে ওই হারটা ৭.৪ শতাংশ। তিয়াত্তর থেকে সাত। একই রোগ, একই মানুষ, একই দেশ। পার্থক্য শুধু কবে ধরা পড়ল। বাংলাদেশে এই রোগে প্রতি বছর প্রায় ছয় হাজার নারী মারা যান। ২০২২ সালে নতুন রোগী ৯,৬৪০, মৃত্যু ৫,৮২৬। আর ওই ছয় হাজার মৃত্যুর বেশিরভাগটা আসলে ক্যান্সারের কারণে না। দেরির কারণে।
দুনিয়ার সব ক্যান্সারের মধ্যে এই একটাই এমন, যেইটা টিকা দিয়া ঠেকানো যায়। আর টিকাটা এই দেশে চইলা আসছে।
সারা দেশে দশ থেকে চোদ্দ বছরের বাষট্টি লাখ মেয়েকে এই টিকা দেয়া হইসে। পঞ্চম থেকে নবম শ্রেণির ছাত্রী, আর যেই মেয়েরা স্কুলেই যায় না তারাও। বিনামূল্যে। তারপর টিকাটা নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচিতে ঢুকায়ে দেওয়া হইসে। এইটা ছোট কাজ না। যাঁরা করসেন তাঁদের কৃতিত্ব দেওয়া উচিত। কিন্তু হিসাবটা করেন। ওই টিকা যারা পাইল, তাদের বয়স তখন দশ থেকে চোদ্দ। মানে আজ যাঁদের বয়স কুড়ির উপরে, তাঁরা কেউ পান নাই। রেহানা পান নাই। আপনার মা পান নাই। আপনার স্ত্রী পান নাই। তাঁদের জন্য একটাই দরজা খোলা ছিল, ওই পাঁচ মিনিটের পরীক্ষাটা। আর ওই দরজাটার সামনে একটা ভালো পর্দা ছিল না।
আমরা প্রমাণ কইরা দিসি যে আমরা পারি। এক মাসে এই রাষ্ট্র সাতটা বিভাগের বাষট্টি লাখ মেয়েকে খুঁজে বাইর করার লক্ষ্য নিসিল। স্কুলে গিয়া, মাদ্রাসায় গিয়া, রাস্তায় থাকা মেয়েদের কাছে গিয়া। এই রাষ্ট্র চাইলে এক মাসে বাষট্টি লাখ মানুষ খুঁজে বাইর করতে পারে। তাহলে ত্রিশ বছরের নারীদের তিন বছরে একবার ডাইকা আনতে পারে না কেন? হাসপাতাল আছে। ২০১৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে ৪৬৫টা সরকারি হাসপাতালে তেত্রিশ লাখ পরীক্ষা হইসে। পরীক্ষাটা বিনামূল্যে।
এখন রেহানার দিকে ফিরা তাকান, আর গোনেন এই ক্যান্সার কোথায় কোথায় থামতে পারত। স্বাস্থ্যকর্মী যেদিন তাঁর বাড়িতে গেসিলেন, বাইর হওয়ার আগে যদি একবার বলতেন, আপা আপনার তো ত্রিশ পার হইসে, উপজেলায় গিয়া একটা পরীক্ষা করায়ে আইসেন, তাহলে থামত। ওই ঘরটায় যদি একটা ভালো পর্দা থাকত, তিনি ফিরা আসতেন না। থামত। ফার্মেসির লোকটা যদি ওষুধ না দিয়া বলত, আপা এইটা ওষুধের ব্যাপার না, ডাক্তার দেখান, তাহলে থামত। আর ওই অন্ধকার রাতে, চাদরের নিচে, স্ত্রী যখন কথাটা বলসিলেন, তখন যদি ঘরের দুইজনের একজনও জানত যে মাসিকের মাঝখানে রক্ত যাওয়া মানে ডাক্তারের কাছে যাওয়া, তাহলে থামত।
রেহানা বাঁচেন নাই। শেষ কয়েকটা মাস ঢাকায় ছিলেন। স্বামী জমি বেচসে, ধার করসে। আর ওই কয়েকটা মাস প্রায় সারাক্ষণ হাসপাতালে ছিলেন। দোকান বন্ধ ছিল। রাতে চেয়ারে বইসা ঘুমাইতেন। ডাক্তারের পিছনে পিছনে হাঁটতেন, রিপোর্ট নিয়া দৌড়াইতেন, রক্ত জোগাড় করতেন। একলা হইলেই কাঁদতেন। নার্সরা বলাবলি করত, লোকটা বউকে খুব ভালোবাসে। তাঁরা ঠিকই বলত। শেষের দিকে একদিন তিনি রেহানার হাত ধইরা বলসিলেন, আমারে মাফ কইরা দিও। রেহানা চোখ মেললেন। একটু হাসলেন। বললেন, কী যে বলো। তুমি তো কত করলা। তারপর আবার ঘুমায়া পড়লেন। তিনি কোনোদিন জানেন নাই। তিনি মরার আগ পর্যন্ত ভাবসেন এইটা তাঁর কপাল।
শেষ দিকে রেহানা বেশিরভাগ সময় ঘুমাইতেন। যখন জাইগা থাকতেন, মেয়েটা পাশে বইসা স্কুলের গল্প বলত। কোন মেয়েটা কী বলল, কোন স্যার কী করলেন। আর মেয়েটা মায়ের হাত ধইরা বইসা থাকত। ওই মেয়েটা তার স্কুলে এইচপিভি টিকা পাইসিল। ক্লাস সেভেনে থাকতে। এক ডোজ, বিনামূল্যে, লাইনে দাঁড়ায়া, বান্ধবীদের সাথে হাসতে হাসতে। সেদিন দুপুরে তার মা তারে স্কুলে পাঠায়ে রান্না চড়াইসিলেন। মেয়েটা বাঁচব। মা বাঁচলেন না। আর ওই লোকটা? তাঁর কিছুই হয় নাই। তিনি ওই ভাইরাসটা বইয়া বেড়াইসেন হয়তো তেরো বছর, হয়তো তারও বেশি। কোনো ব্যথা হয় নাই। কোনো রক্ত যায় নাই। একদিনের জন্যও কোনো ডাক্তারের কাছে যাইতে হয় নাই। তাঁর শরীর একবারের জন্যও তাঁকে কিছু জানায় নাই। বেশিরভাগ পুরুষের ক্ষেত্রেই তাই হয়। জিনিসটা ঢোকে, থাকে, আর কিছুই করে না। আর যায় নারীর শরীরে। একই জিনিস, দুইটা শরীরে। একজনের কাছে ওইটা কিছুই না।আরেকজনের কাছে ওইটা মৃত্যু।
রক্তের কথা তিনি বলতে পারেন নাই। কাপড়টা তিনি লুকায়ে ধুইসেন। পরীক্ষার ঘরটার সামনে থেকে তিনি ফিরা আসছেন। আর যেই লোকটার শরীরে হয়তো রোগটা লুকায়ে থাইক্যা নীরবে রেহানার শরীরে আসছিলো , তাঁর কোনো লজ্জা ছিল না, কোনো ব্যথা ছিল না, কোনো লক্ষণও ছিল না। তিনি আজও বাঁইচা আছেন। দোকান খোলেন। ছেলের সাথে ফোনে কথা বলেন। মেয়েটাকে স্কুলে দিয়া আসেন। আর প্রতিদিন সন্ধ্যায় বারান্দায় গিয়া ওই বারোটা টবে পানি দেন। মরিচ গাছটাতেও দেন। ওই গাছটার বীজ আসছিল বগুড়া থেকে, রেহানার মায়ের উঠান থেকে। ওই মা চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষে ওই মরিচ ডইল্যা ডইল্যা সাদা ভাত নুন দিয়া খাইতেন। গাছটা দুর্ভিক্ষ পার হইসে। আঠারো বছরের সংসার পার হইসে। দুইবার মইরা আবার জন্মাইসে। গাছটা এখনো বাঁইচা আছে। লোকটাও। শুধু যে মানুষটা ওই মরিচের গাছটা এই বারান্দায় নিয়া আসছিল, সে নাই।