08/11/2021
Refractive Eror বা অসংশোধিত দৃষ্টিহীনতা
চোখের যত রকমের রোগ আছে, তার মধ্যে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ হল রিফ্র্যাক্টিভ এরর অর্থাৎ অসংশোধিত দৃষ্টিহীনতা। ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশনের সংখ্যাতত্ত্ব অনুযায়ী সারা বিশ্বে ১৫ কোটি লোক অসংশোধিত দৃষ্টিহীনতায় ভোগেন।
এই দৃষ্টিহীনতার চিকিৎসাস্বরূপ চশমা সর্বাধিক জনপ্রিয়। কিন্তু বিজ্ঞানের অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে চোখ চেয়েছে মুক্তি পেতে চশমার বাঁধন থেকে, আবিষ্কৃত হয়েছে কনট্যাক্ট লেন্স। তারপর কেটে গেছে বহু বছর, সময় বয়ে চলেছে এবং বিজ্ঞান নিয়ে এসেছে এক অসম্ভব স্বপ্নপূরণ। আবিষ্কৃত হয়েছে লাসিক। চশমা নয়, কনট্যাক্ট লেন্স নয়, খালি চোখে দেখা যাবে সব কিছুই। কিন্তু সব কিছুরই একটা সীমাবদ্ধতা থাকে, যেমন আছে চশমার সীমাবদ্ধতা, তেমনই সীমাবদ্ধতা আছে কনট্যাক্ট লেন্সের কিংবা লাসিকের। অতএব, কোনটা কখন কার্যকরি, তা জানা প্রয়োজন।
চশমা কী?
আমাদের চোখ একটা স্বয়ংক্রিয় ক্যামেরার মতো। চোখের কিছু গঠনগত ত্রুটি থাকলে, আমরা কোনও বস্তুকে ঝাপসা দেখি। একটি অতিরিক্ত লেন্স ব্যবহার করে আমরা বস্তুটিকে নিখুঁতভাবে দেখতে পাই। চোখের বাইরের এই অতিরিক্ত লেন্সকে একটি নির্দিষ্ট ফ্রেমে লাগিয়ে ব্যবহার করা হয়, একেই বলে চশমা।
চশমা কত রকমের?
চশমা তিন প্রকারঃ ১) ইউনিফোকাল লেন্স, যা সাধারণত ৩৫-৪০ বছর বয়স পর্যন্ত ব্যবহার করা হয়। ২) বাইফোকাল লেন্স, এটি চল্লিশ-এর কাছাকাছি পৌঁছোলে প্রয়োজন বা একে বলা হয় চালশের চশমা। যাতে দূরের দৃষ্টি ও কাছের দৃষ্টির জন্য আলাদা আলাদা লেন্স থাকে এবং মাঝখানে একটি বিভাজন রেখা থাকে। ৩) প্রোগ্রেসিভ লেন্স নামক আরও এক ধরনের চশমা আছে, যাতে কোনও বিভাজন রেখা ছাড়াই ক্রমানুসারে বিন্যস্ত থাকে। আর এই চশমা শৈশব থেকে বার্ধক্য পর্যন্ত যে-কোনও সময় প্রয়োজন হতে পারে।
চোখের পাওয়ার নির্ধারণ করা হয় কীভাবে?
চোখের পাওয়ার নির্ধারণ করার পদ্ধতির প্রথমে একটি কম্পিউটারের (অরোরিফ্র্যাক্টোমিটার) বা রেটিনোস্কোপির সাহায্যে আমরা প্রাথমিকভাবে চোখের পাওয়ার নির্ধারণ করি। এর দ্বারা পাওয়ার সংক্রান্ত মোটামুটি একটা ধারণা পাওয়া যায়। এরপর প্রত্যেকের আবার হাতেকলমে (ম্যানুয়াল রিফ্র্যাকশন টেস্ট) ট্রায়াল এবং এরর পদ্ধতিতে গ্রহণযোগ্য পাওয়ার নির্ধারণ করা হয়। এই পদ্ধতি সর্বাপেক্ষা গ্রহণযোগ্য।
আর যদি কোনও শিশুর পাওয়ারের ঘাটতি থাকে এবং যদি চশমা না থাকে, ওই চোখে দেখার অভ্যাস তৈরি হয় না। ধীরে ধীরে চোখ অলস হয়ে যায়, একে বলে এমব্লায়োপিয়া বা লেজি আই। তাই প্রত্যেক শিশুর অন্ততপক্ষে ৩-৪ বছর বয়সের মধ্যে একবার দৃষ্টি এবং চশমার পরীক্ষা জরুরি।
শিশুদের ক্ষেত্রে চোখে অ্যাট্রোপিন জাতীয় ঔষধ ব্যবহার করে পাওয়ার নির্ধারণ করা জরুরি। চোখের অভ্যন্তরীণ পেশির অতিরিক্ত সংকোচনশীলতার জন্য পাওয়ার নির্ধারণে গোলমাল হওয়ার সম্ভাবনা, তাই এই বিশেষ ব্যবস্থা।
চশমার ফ্রেম কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
আজকাল চশমার ফ্রেম মানেই ফ্যাশনের জগতে নতুন সংযোজন। তাই আকার বা মাপের নতুনত্ব বা অভিনবত্ব আনতে গিয়ে চশমার মূল উদ্দেশ্যের কথা উৎপাদকেরা অনেক সময় ভুলে যান।
ফ্রেম বাছাই করতে গিয়ে কয়েকটি বিষয় জানার প্রয়োজন আছে। একদিকে ফ্রেম শক্তপোক্ত হবে, অন্যদিকে তা হবে হালকা এবং সুরক্ষাদায়ক। দুটি লেন্সকে ঠিকমতো আটকানোর ব্যবস্থা থাকে এবং ফ্রেমের সঙ্গে তা যেন উলম্ব তলে থাকে। চশমার ফ্রেম ব্যবহারে যাতে কোনও অস্বস্তি না হয় তা দেখার দায়িত্ব একজন অপটিশিয়ানের।
যে-সমস্ত পদার্থ দিয়ে ফ্রেম তৈরি করা হয়, সেইগুলি হল বিভিন্ন ধরনের প্লাস্টিক, ধাতু বা ধাতুসংকর এবং এই দুইয়ের মিশ্রণ। প্লাস্টিকের মধ্যে সেলুলোজ নাইট্রেট বা অ্যাসিটেট (সেলুলয়েড ফ্রেম) হতে পারে। ধাতুগুলির মধ্যে স্টিল, নিকেল, রোল্ড গোল্ড বা অ্যালুমিনিয়ামও হতে পারে। ‘রিমলেস’ চশমাতে লেন্সের সাপোর্ট অপেক্ষাকৃত কম থাকে। ফ্রেমের জন্য অ্যালার্জি হওয়া বিচিত্র নয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয় নিকেলের ফ্রেমে। ফ্রেমের যে-অংশ ত্বকের সংস্পর্শে থাকে সেখানে চাকা-চাকা লাল দাগ, চুলকানি (কনট্যাক্ট ডার্মাটাইটিস) হতে পারে। এছাড়াও ভারী চশমাতে ঘর্ষণ ও চাপের জন্য নাকের বা কানের গোড়ার ত্বকে ঘা হতে পারে।
চশমার ফিটিং-এর সময় কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মাপ খুবই দরকার। যেমন, দুটি তারারন্ধ্রের মধ্যে দূরত্ব (আইপিডি), নাকের ব্রিজের মাপ, কর্ণমূলের উপরিভাগ থেকে লেন্সের অবস্থান কতদূরে হবে তার মাপ, কাটিং-এর সময় লেন্সের কেন্দ্রের মাপ ও সিলিন্ড্রিক্যাল লেন্সের ক্ষেত্রে অক্ষ-র (অ্যাক্সিজ-এর) মাপ। এইসব দেখার দায়িত্ব একজন ভালো অপটিশিয়ানের।
বড়ো ফ্রেমের কিছু অসুবিধা আছে। প্রথমত চশমা ভারী হলে, লেন্সের কেন্দ্র ঠিকঠাক মেপে লাগানো অসুবিধাজনক। হাই পাওয়ারের ক্ষেত্রে বড়ো ফ্রেমের চশমা এড়িয়ে যাওয়াই ভালো।
প্রথম চশমা বা নতুন চশমাতে অসুবিধা হয় কেন?
চশমা ঠিকমতো চোখের সামনে না বসলে নানা অসুবিধা হতে পারে। নাক ও কানের গোড়ায় অস্বস্তি বা বেশি ঢিলে মনে হচ্ছে কিনা অর্থাৎ চশমা ঠিকমতো ‘ফিট’ করেছে কিনা সেটা দেখা দরকার। প্রয়োজনে কিছুদিন অন্তর দোকানে গিয়ে সব ঠিকঠাক করে নিতে হবে। সবসময় নতুন বা প্রথম চশমা ব্যবহারে কিছু না কিছু অসুবিধা হয়ে থাকে। সেইগুলি কাটাতে মোটামুটি তিন সপ্তাহ সময় লাগে।
যেমন সমতল জায়গা উঁচু নীচু মনে হওয়া, সমান্তরাল জায়গা বাঁকা, সিঁড়িতে ওঠা-নামায় অসুবিধা। কোনও জিনিসের উচ্চতা বা গভীরতা নিয়ে খটকা, বৃত্তাকার জিনিস যেন ঠিক বৃত্তাকার নয়, সাইকেল চালাতে অসুবিধা ইত্যাদি।
আবার বাইফোকাল চশমাতে দুই অংশের সংযোগস্থলে চোখ পড়লে উঁচু-নিচু মনে হওয়া অসম্ভব নয়।
অন্যদিকে হাইপাওয়ারের ক্ষেত্রে মাথাধরা গা বমি-বমি ভাব– এমনটি মনে হতেই পারে। ফ্রেমের জন্য অসুবিধা হতে পারে। লেন্সের কেন্দ্রের অবস্থান ঠিক না হওয়ার জন্য প্রিজমাটিক এফেক্ট– যার ফলে দৃষ্টি ঝাপসা হতে পারে।
চশমা ঠিকমতো ‘ফিট’ না হওয়ার কারণ কী?
১) কোথাও কোনও ভুল না থাকা সত্ত্বেও কেবলমাত্র ‘প্রথম’ চশমা ব্যবহার করার জন্য। অর্থাৎ এটা মানসিক অস্বস্তি।
২) অপ্টোমেট্রিস্টের ব্যবস্থাপত্র অনুসারে চশমা না বানানো।
৩) চশমার ফ্রেমের ত্রুটি।
৪) অপ্টোমেট্রিস্টের প্রেসক্রিপশনে ভুল থাকা।
৫) চশমার কাচের স্বভাবগত কারণ যেমন উচ্চ মাইনাস বা প্লাস পাওয়ারের জন্য।
খুব বেশি ডায়াবেটিস বা চোখের প্রেসার বেশি থাকলে চশমার পাওয়ার ঘনঘন পালটাতে থাকে। সপ্তাহ খানেকের মধ্যেও হতে পারে এই সমস্যা। তাই এই রোগ দুটি থাকলে ডাক্তারবাবুকে জানাতে ভুলবেন না।