02/03/2023
।। শ্রীরামকৃষ্ণের জন্মশতবর্ষ উদযাপন ।।
বেলুড় মঠে তথা সারা পৃথিবী জুড়ে পালিত হয়েছিল শ্রীশ্রীঠাকুরের জন্মশতবর্ষ উৎসব, সারা বছর ধরে। এই উপলক্ষে শতবার্ষিকী কমিটি আয়োজিত ধর্মমহাসভা ১ মার্চ থেকে ৮ মার্চ ১৯৩৭ পর্যন্ত আটদিন ধরে চলেছিল। প্রতি পর্বের অনুষ্ঠানে পূজ্যপাদ বিজ্ঞানানন্দজী মহারাজ উপস্থিত থাকতেন এবং চুপচাপ নিবিষ্টমনে সব শুনতেন।
সমগ্র উৎসবের মূল হোতা স্বামী সম্বুদ্ধানন্দের বিশেষ অনুরোধে একটি পর্বের অনুষ্ঠানে মহাকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সভাপতি হতে রাজি হন। সভার বন্দোবস্তের ব্যাপারে প্রথমে একটু সংশয় থাকলেও মহারাজজীর সুনিপুণ আয়োজনের কথা শুনে তাঁর আর কোনও আপত্তি থাকে নি।
রবীন্দ্রনাথ যখন সভাস্থলে প্রবেশ করলেন তখন সেখানে পূর্ণ নীরবতা বিরাজ করছে। তাঁকে বসানো হলো একটি আরামকেদারায়। সেদিন ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট হল-এর অনুষ্ঠানে উপস্থিত ১৫০০ শ্রোতা বিমুগ্ধ হয়ে শুনেছিল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের অসাধারণ ভাষণ। পুরো সভাকক্ষে তখন বিরাজ করেছিল এক নিরবচ্ছিন্ন স্তব্ধতা। ভাষণ শেষেও তিনি দীর্ঘক্ষণ মঞ্চেই বসে রইলেন, বাড়ি ফিরে যাবার কথা বেমালুম ভুলে গেলেন। সম্বুদ্ধানন্দজী তাঁর শরীর নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করলে, তাঁর উত্তর : "স্বামীজী, আমার শরীর একদম ঠিক আছে, পুরো অনুষ্ঠানটি আমি খুব উপভোগ করছি।" মহারাজ পরের দিন তাঁর টানা তিন ঘন্টার ওপর মিটিং-এ বসে থাকার জন্য কোন কষ্ট-অসুবিধা হয়েছিল কিনা বাড়িতে গিয়ে দেখা করে জানতে গেলে রবীন্দ্রনাথ বললেন, "আমি একদম সুস্থ রয়েছি। আপনাদের অসংখ্য ধন্যবাদ। এযাবৎ কখনোই আমার এত সুষ্ঠু ও সুপরিচালিত সভায় যোগদানের সুযোগ হয় নি। রামকৃষ্ণ মিশনের এই সাংগঠনিক দক্ষতার পরিচয় পেয়ে আমি সত্যিই অভিভূত। আপনারা সবাই মিলে একটি সত্যিকারের বিরাট কাজ করেছেন।"
শতবার্ষিক উৎসব বেলুড় মঠ ছাড়াও বহু স্থানে বহু সহরে এমনকি প্রত্যন্ত অঞ্চলেও পালিত হয় সাড়ম্বরে। এর মধ্যে কেশব সেনের বাসভবন 'কমল কুটির' ও কালীঘাটে এই উৎসবপালন বিশেষ উল্লেখনীয়। রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন আশ্রমেও শ্রীরামকৃষ্ণ শতবর্ষজয়ন্তী পালিত হয়। প্রার্থনাগৃহটি ফুল, আলপনা দিয়ে সাজানো হয়। শ্রীরামকৃষ্ণের উদার ভাব নিয়ে আলোচনা করেন পণ্ডিত ক্ষিতিমোহন সেন শাস্ত্রী। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের এই জন্মোৎসব-পালন অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন উপাচার্য ডঃ শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।
বিদেশে নিউ ইয়র্ক, সানফ্রান্সিসকো, বোস্টন, ওয়াশিংটন, প্রভিডেন্স, বুয়েন্স আয়ার্স, লন্ডন, প্যারিস, বার্লিন, রোম, ওয়ারশ, সিডনি, টোকিও, সাংহাই, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া ইত্যাদি স্থানে এই উৎসবপালন সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। আফ্রিকা মহাদেশের টাঙ্গানিকা, তানজানিয়া, জাঞ্জিবার, মোম্বাসা, রোডেশিয়াতেও এসেছিল শতবার্ষিকীর এই প্রবাহ। উৎসব পালিত হয় দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গ ও নাটালে। কলকাতার সভাগুলিতে প্রায় কুড়িটি বিদেশী রাষ্ট্রের প্রতিনিধিগণ উপস্থিত ছিলেন। সভায় তিব্বতি ও আরবিসহ দশটি ভাষায় প্রবন্ধ পাঠ করা হয়। ভারতের জাতীয় আবেগকে এই শতবার্ষিকী ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছিল। হিন্দু, জৈন, শিখ, ইসলাম প্রভৃতি বিভিন্ন ধর্মের লোকেরা নিজ নিজ ধর্মের প্রতীক ইত্যাদি নিয়ে এক মাইলব্যাপী বিশাল শোভাযাত্রা করেন, যেটি দেশবন্ধু পার্ক থেকে শুরু হয়ে শেষ হয় ময়দানে। শোভাযাত্রার পুরোভাগে একটি লরিতে শ্রীরামকৃষ্ণের বিশাল প্রতিকৃতি সুসজ্জিত করে তার সামনে চলেন হলুদ পোশাক পরিহিত কৃপাণ ও দণ্ড-হস্তে শিখধর্মাবলম্বীরা ।
শতবার্ষিকী উৎসবে কাশীতেও আয়োজিত হয় এক সর্বধর্মসম্মেলন, যাতে অংশগ্রহণ করেন বহু বিশিষ্ট মণ্ডলেশ্বর পদবীভূষিত সন্ন্যাসীগণ। শ্রীশ্রীঠাকুরের প্রতিকৃতি নিয়ে হয় নগর পরিক্রমা। প্রতিষ্ঠিত হয় অদ্বৈত আশ্রমের নবনির্মিত মন্দিরে শ্রীরামকৃষ্ণের সর্বপ্রথম মর্মরমূর্তি।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এই শত বার্ষিকীতেই নিবেদন করেন তাঁর বহুপরিচিত কবিতাটি : 'বহু সাধকের বহু সাধনার ধারা...।'
সেসময়কার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাদীর্ণ ভারতবর্ষে এই উৎসবপালন এবং সর্বধর্মসম্মেলন-অনুষ্ঠান বিপুলভাবে অভিনন্দিত হয়েছিল। মানব-ইতিহাসে আগে আর কখনো একজন মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি এভাবে সর্বজনপূজ্য হয়েছেন বলে জানা যায় না।
('শ্রীরামকৃষ্ণ : চিন্তনে ও মননে' গ্রন্থের দুটি প্রবন্ধ থেকে নির্বাচিত অংশ)