29/12/2025
প্রশ্ন : ওশো, শোনা যায় যোগ একটি নাস্তিক দর্শন। আপনি কি এতে একমত?
ওশোর উত্তর: আবারও বলছি, যোগ না আস্তিক, না নাস্তিক। যোগ একটি সরল বিজ্ঞান। এটি ঈশ্বরবাদীও নয়, নাস্তিকবাদীও নয়। পতঞ্জলি সত্যিই অসাধারণ এক বিস্ময়কর মানুষ। তিনি ঈশ্বর নিয়ে কথা বলেন না। আর যদি একবার কোথাও ঈশ্বরের কথা বলেনও, সেখানেও বলেন এটি চূড়ান্ত সত্যে পৌঁছানোর বহু পদ্ধতির একটি মাত্র পদ্ধতি।
ঈশ্বরে বিশ্বাস চূড়ান্ত সত্য নয়, বরং চূড়ান্ত সত্যে পৌঁছানোর একটি কৌশল। ঈশ্বরে বিশ্বাস করলে প্রার্থনা সম্ভব হয়, সমর্পণ সম্ভব হয়। গুরুত্ব ঈশ্বরের নয়, গুরুত্ব প্রার্থনাবোধ ও সমর্পণের।
পতঞ্জলি সত্যিই অবিশ্বাস্য! তিনি বলেন ঈশ্বর, ঈশ্বরে বিশ্বাস, ঈশ্বরের ধারণা এসবও সত্যে পৌঁছানোর বহু পথের একটি পথ মাত্র। “ঈশ্বরপ্রণিধান”—ঈশ্বরে বিশ্বাস করাও কেবল একটি পথ, কিন্তু বাধ্যতামূলক নয়। চাইলে তুমি অন্য পথ বেছে নিতে পারো। বুদ্ধ ঈশ্বরে বিশ্বাস না করেই সেই চূড়ান্ত সত্যে পৌঁছেছেন। তিনি এমন একটি পথ বেছে নিয়েছিলেন, যেখানে ঈশ্বরের প্রয়োজন নেই।
ধরো, তুমি আমার বাড়িতে এসেছো একটি নির্দিষ্ট রাস্তা দিয়ে। কিন্তু সেই রাস্তাই লক্ষ্য নয়; রাস্তা ছিল কেবল মাধ্যম। তুমি অন্য রাস্তা দিয়েও একই বাড়িতে পৌঁছাতে পারতে। অন্যরা অন্য রাস্তা দিয়ে এসেছে। তোমার রাস্তায় হয়তো বড় বড় সবুজ গাছ ছিল, অন্য রাস্তায় নাও থাকতে পারে। ঠিক তেমনই, ঈশ্বর হলো একটি পথ মাত্র। মনে রেখো ঈশ্বর লক্ষ্য নয়, ঈশ্বর কেবল একটি পথ।
পতঞ্জলি কখনো অস্বীকার করেন না, আবার অনুমানও করেন না। তিনি সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক। খ্রিস্টানদের বোঝা কঠিন–কীভাবে বুদ্ধ ঈশ্বরে বিশ্বাস না করেও চূড়ান্ত সত্যে পৌঁছাতে পারলেন। হিন্দুদের বোঝা কঠিন—কীভাবে মহাবীর ঈশ্বরে বিশ্বাস না করেও মুক্তি লাভ করলেন।
পাশ্চাত্য চিন্তাবিদরা যখন পূর্বের ধর্মগুলোর সঙ্গে পরিচিত হননি, তখন তারা ধর্মকে সবসময় ঈশ্বরকেন্দ্রিক বলেই সংজ্ঞায়িত করতেন। কিন্তু যখন তারা দেখলেন এখানে এমন এক প্রাচীন পথ আছে, যেখানে ঈশ্বর ছাড়াই সত্যে পৌঁছানো যায় তারা বিস্মিত হয়ে বললেন, “এটা অসম্ভব!”
এইচ. জি. ওয়েলস বুদ্ধ সম্পর্কে লিখেছেন বুদ্ধ হলেন ইতিহাসের সবচেয়ে নাস্তিক মানুষ, অথচ একই সঙ্গে সবচেয়ে ধার্মিক। তিনি কখনো ঈশ্বরে বিশ্বাস করেননি, কাউকেও ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে বলেননি। অথচ তাঁর মধ্যেই ঈশ্বরত্বের সর্বোচ্চ প্রকাশ ঘটেছে। মহাবীরও এমন এক পথে হেঁটেছেন, যেখানে ঈশ্বরের দরকার নেই।
পতঞ্জলি সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক। তিনি বলেন আমাদের লক্ষ্য মাধ্যম নয়। মাধ্যম হাজার হাজার হতে পারে। লক্ষ্য একটাই সত্য। কেউ ঈশ্বরের মাধ্যমে সেই সত্যে পৌঁছেছে, ঠিক আছে তুমি ঈশ্বরে বিশ্বাস করো, লক্ষ্য অর্জন করো। লক্ষ্য অর্জনের পর তোমাকে সেই বিশ্বাস ফেলে দিতে হবে। বিশ্বাস কেবল একটি উপায়। আর যদি তুমি বিশ্বাস না করো—তাও ঠিক আছে। বিশ্বাসহীনতার পথ ধরে এগিয়ে চলো এবং লক্ষ্যে পৌঁছাও।
তিনি না আস্তিক, না নাস্তিক। তিনি কোনো ধর্ম তৈরি করছেন না। তিনি কেবল সব সম্ভাব্য পথ এবং রূপান্তরের সব নিয়ম তোমার সামনে উন্মুক্ত করছেন। ঈশ্বর সেসব পথের একটি, বাধ্যতামূলক নয়। তুমি যদি ঈশ্বরহীন হও, তবু তোমার ধার্মিক হওয়ার দরকার নেই। পতঞ্জলি বলেন ঈশ্বর ছাড়াও তুমি পৌঁছাতে পারো। ঈশ্বর নিয়ে মাথা ঘামিও না। এই হলো নিয়ম, এই হলো পরীক্ষা, এই হলো ধ্যান–এর ভেতর দিয়ে যাও।
তিনি কোনো ধারণার ওপর জোর দেন না। এটাই ছিল সবচেয়ে কঠিন কাজ। তাই পতঞ্জলির যোগসূত্র অনন্য, বিরল। এমন গ্রন্থ আগে কখনো হয়নি, ভবিষ্যতেও আর হওয়ার সম্ভাবনা নেই। যোগ সম্পর্কে যা কিছু বলার ছিল, তিনি সবই বলেছেন কিছুই বাদ রাখেননি। কেউ আর এতে নতুন কিছু যোগ করতে পারবে না। কারণ তিনি পক্ষপাতদুষ্ট নন। পক্ষপাত থাকলে এমন সম্পূর্ণতা সম্ভব হতো না।
বুদ্ধ পক্ষপাতী, মহাবীর পক্ষপাতী, যিশু পক্ষপাতী, মুহাম্মদ পক্ষপাতী তাঁদের প্রত্যেকেরই একটি নির্দিষ্ট পথ আছে। এই পক্ষপাত হয়তো তোমার জন্যই—তোমার প্রতি গভীর করুণার কারণে। তারা সারাজীবন একটি পথের ওপর জোর দেন এবং বলেন, “এই পথই সঠিক, অন্য সব ভুল।” এর কারণ—তোমার মধ্যে বিশ্বাস সৃষ্টি করা। তুমি এত সন্দেহে ভরা যে, যদি তারা বলতেন—“এই পথও ঠিক, ও পথও ঠিক”—তাহলে তুমি কোনো পথেই হাঁটতে না।
এই একমাত্রিকতা সত্য নয় এটা কেবল তোমার জন্য একটি কৌশল। তুমি আগেই অনিশ্চিত; তোমার এমন কাউকে দরকার, যে তোমার চোখে সম্পূর্ণ নিশ্চিত। তাই তারা পক্ষপাতী সেজেছেন।
কিন্তু পক্ষপাত থাকলে সম্পূর্ণ ক্ষেত্রকে ধরা যায় না। পতঞ্জলি পক্ষপাতহীন। তিনি তোমার চেয়ে পথের গঠন নিয়েই বেশি ভাবিত। তিনি কোনো মিথ্যা ব্যবহার করবেন না, কোনো কৌশল নেবেন না, তোমার সঙ্গে আপস করবেন না। কোনো বিজ্ঞানীই আপস করতে পারে না।
বুদ্ধ আপস করতে পারেন—কারণ তাঁর মধ্যে গভীর মানবিক করুণা আছে। তিনি তোমাকে সাহায্য করতে গিয়ে সত্যকেও আংশিক ঢেকে রাখতে পারেন। কিন্তু পতঞ্জলি আপসহীন। যা সত্য, তিনি সেটাই বলেন। এক চুলও নেমে আসেন না। বিজ্ঞান এমনই হয়। আপস করলে বিজ্ঞান ধর্মে পরিণত হয়।
তিনি না আস্তিক, না নাস্তিক; না হিন্দু, না মুসলমান, না খ্রিস্টান, না জৈন, না বৌদ্ধ। তিনি একেবারে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানী—কোনো মিথ ছাড়াই সত্যকে উন্মোচিত করছেন। তিনি একটি উপমাও ব্যবহার করবেন না। যিশু গল্প বলেন, কারণ তুমি শিশু—তুমি গল্পেই বোঝো। বুদ্ধ গল্প বলেন, যাতে তুমি সামান্য ঝলক পেতে পারো।
আমি এক হাসিদি ইহুদি গুরু বাল শেম-এর গল্প পড়ছিলাম…
তিনি একটি ছোট গ্রামে রাব্বি ছিলেন। যখনই গ্রামে কোনো বিপদ আসত—কোনো রোগ, কোনো মহামারি, কোনো দুর্যোগ—তিনি জঙ্গলে চলে যেতেন। জঙ্গলের ভেতরে একটি নির্দিষ্ট জায়গায়, একটি নির্দিষ্ট গাছের নিচে তিনি যেতেন। সেখানে তিনি একটি বিশেষ রীতিতে আগুন জ্বালাতেন, কিছু আচার পালন করতেন এবং তারপর ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করতেন।
এবং প্রতিবারই এমন হতো—গ্রাম থেকে বিপদ সরে যেত, রোগ চলে যেত, সংকট কেটে যেত।
এরপর বাল শেম মারা গেলেন। তাঁর উত্তরসূরি এলেন। আবার একদিন গ্রামে বিপদ দেখা দিল। গ্রামবাসীরা নতুন রাব্বিকে অনুরোধ করল—তিনি যেন বনে গিয়ে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করেন।
নতুন রাব্বি খুবই অস্থির হয়ে পড়লেন, কারণ তিনি জানতেন না সেই নির্দিষ্ট জায়গাটা কোথায়, কোন গাছের নিচে তাঁর গুরু যেতেন। তবুও তিনি জঙ্গলে গেলেন, যেকোনো একটি গাছের নিচে দাঁড়ালেন, আগুন জ্বালালেন, আচার করলেন এবং ঈশ্বরকে বললেন—
“আমি জানি না ঠিক কোন জায়গায় আমার গুরু প্রার্থনা করতেন, কিন্তু আপনি তো সব জানেন। আপনি সর্বব্যাপী, সর্বশক্তিমান। তাই জায়গা জানা জরুরি নয়। আমার গ্রাম বিপদে আছে—দয়া করে কিছু করুন।”
এবং আশ্চর্যজনকভাবে—বিপদ কেটে গেল।
এরপর সেই রাব্বিও মারা গেলেন। তাঁরও একজন উত্তরসূরি এলেন। আবার গ্রামে সংকট দেখা দিল। লোকজন তাঁর কাছে এলো।
এই রাব্বি আরও বিপদে পড়লেন তিনি প্রার্থনাটাই ভুলে গিয়েছিলেন। তবুও তিনি জঙ্গলে গেলেন, যেকোনো জায়গায় দাঁড়ালেন। আগুন জ্বালানোর নিয়মও তিনি ঠিকমতো জানতেন না, তবুও কোনোভাবে আগুন জ্বালালেন এবং ঈশ্বরকে বললেন—
“আমি জানি না কীভাবে আচার করতে হয়, আমি জানি না সেই নির্দিষ্ট জায়গা কোথায়, এমনকি আমি প্রার্থনাটাও ভুলে গেছি। কিন্তু আপনি তো সব জানেন। আমার জানা না-জানাটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। দয়া করে যা প্রয়োজন, তাই করুন।”
তিনি ফিরে এলেন—এবং গ্রাম আবার রক্ষা পেল।
এরপর তিনিও মারা গেলেন। আবার একজন নতুন উত্তরসূরি এলেন। আবার গ্রাম সংকটে পড়ল। লোকজন তাঁর কাছে এলো।
এই রাব্বি আর জঙ্গলে গেলেন না। তিনি নিজের চেয়ারেই বসে থাকলেন এবং ঈশ্বরকে বললেন—
“আমি কোথাও যেতে চাই না। আপনি তো সর্বত্র আছেন। আমি কোনো প্রার্থনা জানি না, কোনো আচারও জানি না। কিন্তু তাতে কী আসে যায়? আমার জানাটা গুরুত্বপূর্ণ নয় আপনি তো সব জানেন।
আমি শুধু আমার পূর্বপুরুষদের গল্পটা জানি—বাল শেম কী করতেন, তাঁর উত্তরসূরি কী করতেন, তার পরের জন কী করতেন। আমি সেই গল্পটাই আপনাকে বলছি। এখন আপনি যা সঠিক মনে করেন, তাই করুন।”
এবং বলা হয়—বিপদ আবার সরে গেল।
কথিত আছে ঈশ্বর গল্পটা এতটাই ভালোবেসেছিলেন যে তিনি গ্রামটিকে রক্ষা করেছিলেন।
মানুষ গল্প ভালোবাসে, আর মানুষের ঈশ্বরও গল্প ভালোবাসেন। গল্পের মধ্য দিয়েই মানুষ কখনো কখনো সত্যের একটি ঝলক পেয়ে যায়।
কিন্তু পতঞ্জলি একটি গল্পও ব্যবহার করবেন না। আমি আগেই বলেছি—তিনি যেন আইনস্টাইন ও বুদ্ধ একসঙ্গে। বুদ্ধের মতো অন্তর্জ্ঞান, আইনস্টাইনের মতো বিশ্লেষণী মন। অথচ তিনি কারো নন।
ঈশ্বরবাদ একটি গল্প, নাস্তিকবাদ তার বিপরীত গল্প। দুটোই মানুষের তৈরি মিথ। কারো কাছে একটিতে আকর্ষণ, কারো কাছে অন্যটিতে। পতঞ্জলি গল্পে আগ্রহী নন—তিনি নগ্ন সত্যে আগ্রহী। তিনি সত্যকে সাজাবেন না, ঢাকবেন না।
আমরা চলবো এক শুষ্ক মরুভূমির পথে। মরুভূমিরও নিজস্ব সৌন্দর্য আছে—বিশালতা, অসীমতা। তিনি তোমাকে কোনো গাছ দেবেন না ছায়া নেওয়ার জন্য। দেবেন কেবল নিরেট তথ্য। একটিও অপ্রয়োজনীয় শব্দ ব্যবহার করবেন না এই জন্যই এর নাম ‘সূত্র’।
সূত্র মানে—ন্যূনতম, একেবারে সারাংশ।
পতঞ্জলির সূত্রগুলো যেন টেলিগ্রাম। তিনি কৃপণ—একটিও বাড়তি শব্দ খরচ করেন না।
তাই জিজ্ঞেস করো না তিনি আস্তিক না নাস্তিক। এগুলো গল্প। বাস্তবতা বিশ্বাসে নয়, বাস্তবতা তোমার মধ্যে। বাস্তবতা মনের বিষয়বস্তুর ঊর্ধ্বে।
পতঞ্জলি বলেন—এই পুরো মনটাই ফেলে দাও। এর ভেতরে যা কিছু আছে সবই আবর্জনা। বাইবেল, গীতা, সব শাস্ত্র সব ছুঁড়ে ফেলো। তিনি কোনো আপস করবেন না। আর এটাই তাঁর সৌন্দর্য, এটাই তাঁর অনন্যতা।
মূল: ওশো রজনীশ
অনুবাদ: আধ্যাত্মিক জগতের বাণী