11/06/2026
একজন সংগ্রামী সজ্জন মানুষের অনন্তযাত্রা: আতিকুল হায়দার ভাই।
মানুষের জীবন যেন এক ক্ষণিকের সফর। জন্মের পর থেকে আমরা প্রতিনিয়ত ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনি, পরিবার গড়ি, সংগ্রাম করি, সাফল্যের পেছনে ছুটি। কিন্তু জীবনের শেষ অধ্যায় কখন এসে যায়, তা কেউ জানে না। মৃত্যুই একমাত্র সত্য, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে পৃথিবীতে আমরা সবাই অস্থায়ী অতিথি। মানুষের রেখে যাওয়া সম্পদ নয়, বরং তার কর্ম, চরিত্র এবং মানুষের হৃদয়ে রেখে যাওয়া ভালোবাসাই তাকে মৃত্যুর পরও জীবন্ত রাখে।
দুদিন যাবৎ গভীর শোকাহত হয়ে আছি, জাপানে প্রায় ৩৮ বছর ধরে বসবাসরত বাংলাদেশি কমিউনিটির অত্যন্ত পরিচিত ও শ্রদ্ধেয় মুখ, কাওয়াগুচি এলাকার বাসিন্দা আতিকুল হায়দার ভাই ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে গত ৮ জুন ২০২৬, সোমবার রাত ৮টা ১০ মিনিটে জাপানের ওজিসেইকিয়ো হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৩ বছর।
মরহুমের দেশের বাড়ি কুমিল্লায়। তিনি রেখে গেছেন তাঁর বড় ছেলে লাবিব, যিনি বর্তমানে চাকরিরত, এবং মেয়ে লামিয়া, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে অধ্যয়নরত। তাঁর বিদায়ে শুধু একটি পরিবার নয়, জাপান প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজ হারালো একজন অভিজ্ঞ, সংগ্রামী ও মানবিক মানুষকে।
আজকের নতুন প্রজন্ম হয়তো কল্পনাও করতে পারবে না, প্রায় চার দশক আগে জাপানে একজন বাংলাদেশি অভিবাসীর জীবন কতটা কঠিন ছিল। ভাষা, সংস্কৃতি, পরিবেশ, কাজের সুযোগ এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা, সবকিছুই ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। আতিকুল হায়দার ভাইও সেই কঠিন পথেরই একজন সাহসী পথিক ছিলেন। সীমিত সুযোগ-সুবিধার সময়ে তিনি ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে জাপানি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। জীবনের শুরুতে নানা ধরনের পার্টটাইম কাজ করেছেন, কঠোর পরিশ্রম করেছেন, কখনো হাল ছাড়েননি।
পরবর্তীতে তিনি বিভিন্ন ব্যবসায়িক উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হন এবং ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান গড়ে তোলেন। সাফল্য তাঁর কাছে সহজে আসেনি; বরং দীর্ঘ সংগ্রাম, পরিশ্রম, সততা এবং মানুষের প্রতি আস্থার মাধ্যমে তিনি সেই সাফলন অর্জন করেছিলেন। প্রবাস জীবনের ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি সন্তানদের শিক্ষিত ও সুশিক্ষায় গড়ে তোলার বিষয়ে ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। একজন দায়িত্বশীল পিতা হিসেবে তিনি নিজের স্বপ্নের পাশাপাশি সন্তানদের ভবিষ্যৎ নির্মাণেও নিরলসভাবে কাজ করেছেন।
হায়দার ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় হয় প্রায় সাত বছর আগে, টোকিওতে বাংলাদেশ কমিউনিটির একটি অনুষ্ঠানে। সেই পরিচয় ধীরে ধীরে আন্তরিকতায় রূপ নেয়। তাঁর বাসায় দাওয়াতে যাওয়ার সুযোগও হয়েছে। কাছ থেকে যতটুকু দেখেছি, তিনি ছিলেন একজন হাসিখুশি, নিরঅহংকারী, পরোপকারী এবং অত্যন্ত আন্তরিক মানুষ। মানুষের উপকার করতে তিনি কখনো কার্পণ্য করতেন না। কমিউনিটির যেকোনো প্রয়োজনে তাঁকে পাশে পাওয়া যেত।
জাপানে বাংলাদেশি কমিউনিটির বিভিন্ন সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে তাঁর অবদান ছিল উল্লেখযোগ্য। একইসঙ্গে বাংলাদেশেও তাঁর সহায়তায় বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়েছে এবং অসংখ্য মানুষ উপকৃত হয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, মানুষের প্রকৃত সাফল্য শুধু নিজের উন্নতিতে নয়, বরং সমাজের জন্য কিছু রেখে যাওয়ার মধ্যেই নিহিত।
গতকাল টোকিওসহ জাপানের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিপুল সংখ্যক বন্ধু, শুভাকাঙ্ক্ষী ও কমিউনিটির সদস্যরা বাইতুল আমান মসজিদ কমপ্লেক্সে উপস্থিত হয়ে অশ্রুসজল নয়নে তাঁর জানাজায় অংশগ্রহণ করেন এবং শেষ বিদায় জানান। অনেকের চোখে ছিল স্মৃতির আবেগ, অনেকের কণ্ঠে ছিল তাঁর মানবিকতার গল্প। শোকাহত পরিবেশে সবাই তাঁর জন্য দোয়া করেন এবং তাঁর পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান। তাঁর মরদেহ বাংলাদেশ দূতাবাস, টোকিওর তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত হয়তো তিনি ভেবেছিলেন পরিবারকে নিয়ে আরও কিছু সময় কাটাবেন, আরও কিছু স্বপ্ন পূরণ করবেন। কিন্তু মহান আল্লাহর ডাকে সাড়া দিয়ে তাঁকে চলে যেতে হয়েছে এমন এক জগতে, যেখান থেকে আর কেউ ফিরে আসে না। এটাই জীবনের চিরন্তন বাস্তবতা। মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার সততা, সংগ্রাম, ভালোবাসা এবং মানবিকতার গল্প বেঁচে থাকে প্রজন্মের পর প্রজন্ম।
আতিকুল হায়দার ভাই আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর সংগ্রামী জীবন, কর্মময় পথচলা, হাসিমাখা মুখ, মানবিক আচরণ এবং সমাজের জন্য অবদান তাঁকে দীর্ঘদিন স্মরণীয় করে রাখবে।
আল্লাহ তাআলা মরহুম আতিকুল হায়দার ভাইকে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন, তাঁর সকল গুনাহ ক্ষমা করে দিন, কবরের জীবনকে শান্তিময় করুন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারকে ধৈর্য ও শক্তি দান করুন।
ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।