06/27/2026
১৯৬২ সালের মে মাস।
আর্কটিক মহাসাগরের ভাসমান বরফের ওপর স্থাপিত সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি গোপন গবেষণা কেন্দ্র, নর্থ পোল-৮ (NP-8), হঠাৎ করেই পরিত্যক্ত হয়ে যায়।
বরফের রানওয়েতে বড় ধরনের ফাটল দেখা দেওয়ায় সেখানে থাকা বিজ্ঞানী ও কর্মীদের দ্রুত সরিয়ে নেওয়া হয়। তাড়াহুড়োয় ফেলে যেতে হয় অসংখ্য নথি, যন্ত্রপাতি ও গবেষণাসামগ্রী।
যেখানে সোভিয়েতরা দেখেছিল বিপদ, সেখানেই সুযোগ দেখেছিল যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা।
সিআইএর সহযোগিতায় মার্কিন বিমানবাহিনীর মেজর জেমস এফ. স্মিথ এবং নৌবাহিনীর লেফটেন্যান্ট লিওনার্ড লে-শ্যাককে প্যারাশুটে নামিয়ে দেওয়া হয় সেই ভাসমান বরফচাঁইয়ের ওপর।
তাদের হাতে সময় ছিল সর্বোচ্চ ৭২ ঘণ্টা। যেকোনো মুহূর্তে বরফ ভেঙে পুরো স্টেশন সমুদ্রের নিচে হারিয়ে যেতে পারত।
এই অল্প সময়ের মধ্যেই তারা পুরো স্টেশন ঘুরে ছবি তোলেন, গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র সংগ্রহ করেন এবং প্রায় ১৫০ পাউন্ড ওজনের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ ও গবেষণা-উপকরণ উদ্ধার করেন।
কিন্তু আসল চ্যালেঞ্জ ছিল ফিরে আসা।
বরফ এতটাই ভঙ্গুর হয়ে গিয়েছিল যে সেখানে কোনো বিমান অবতরণ করা সম্ভব ছিল না।
তখন ব্যবহার করা হয় স্নায়ু যুদ্ধের সবচেয়ে অদ্ভুত উদ্ধার প্রযুক্তিগুলোর একটি- ফুলটন স্কাইহুক (Fulton Skyhook)।
প্রত্যেক অফিসারের সঙ্গে একটি ৫০০ ফুট লম্বা নাইলনের দড়ি যুক্ত করা হয়, যার অন্য প্রান্তে ছিল হিলিয়ামভর্তি একটি বেলুন।
এরপর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটি পরিবর্তিত বি-১৭ বোমারু বিমান নিচু দিয়ে উড়ে এসে নাকের সামনে লাগানো বিশেষ ধাতব 'হর্ন' দিয়ে সেই দড়ি আটকে ফেলে। পরে উইঞ্চের সাহায্যে আকাশেই টেনে তোলা হয় দুই কর্মকর্তাকে।
প্রবল আর্কটিক বাতাসে লে-শ্যাককে বিমান দড়ি ধরার আগে প্রায় ৩০০ ফুট বরফের ওপর টেনে নিয়ে যায়। অন্যদিকে স্মিথ নিজের পালা আসা পর্যন্ত বরফের ফাটলে গোড়ালি আটকে রেখে নিজেকে ভেসে যাওয়া থেকে রক্ষা করেন।
শেষ পর্যন্ত দুজনই নিরাপদে ফিরে আসেন।
তাদের উদ্ধার করা নথিপত্র বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্র জানতে পারে, সোভিয়েত ইউনিয়ন আর্কটিকের বরফের নিচে চলাচলকারী মার্কিন সাবমেরিন শনাক্ত করার জন্য উন্নত অ্যাকুস্টিক প্রযুক্তি তৈরি করছিল, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে তখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের কোনো ধারণাই ছিল না।
স্নায়ু যুদ্ধের ইতিহাসে এই অভিযানকে সবচেয়ে সাহসী ও অভিনব গোয়েন্দা অভিযানের একটি হিসেবে ধরা হয়।
কারণ মাত্র দুজন মানুষ, একটি হিলিয়াম বেলুন, ভাঙতে থাকা বরফ আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পুরনো একটি বোমারু বিমান- এসব দিয়েই তারা উন্মোচন করেছিলেন সোভিয়েত ইউনিয়নের এক গোপন সামরিক প্রকল্প।