28/09/2026
🌙 Kids Seerah Challenge
পর্ব ১৯ | হুদাইবিয়ার সন্ধি — ধৈর্য, শান্তি ও আল্লাহর ওপর ভরসা ﷺ
উমরাহর উদ্দেশ্যে মক্কার পথে
খন্দকের যুদ্ধের পর পঞ্চম হিজরি বছর পার হলো। ষষ্ঠ হিজরি সালে রাসুলুল্লাহ ﷺ স্বপ্নে দেখলেন, তিনি সাহাবিদের সঙ্গে মক্কায় প্রবেশ করছেন এবং উমরাহ পালন করছেন। নবীদের স্বপ্ন সত্য ও আল্লাহর পক্ষ থেকে ওহি। তাই রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের নিয়ে উমরাহর উদ্দেশ্যে মক্কার পথে যাত্রা করলেন।
সীরাহর প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, তাঁর সঙ্গে প্রায় ১,৪০০ সাহাবি ছিলেন। তাঁরা যুদ্ধ করতে যাচ্ছিলেন না; তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল পবিত্র কাবাঘর তাওয়াফ করা এবং উমরাহ পালন করা। তাই তাঁরা ইহরাম পরেছিলেন এবং কুরবানির পশুও সঙ্গে নিয়েছিলেন।
হুদাইবিয়ায় থামতে হলো
মক্কার কুরাইশরা মুসলমানদের আসার খবর পেয়ে তাঁদের মক্কায় প্রবেশ করতে বাধা দিল। রাসুলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবিরা হুদাইবিয়া নামের জায়গায় অবস্থান করলেন। সেখানে রাসুলুল্লাহ ﷺ শান্তিপূর্ণভাবে বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করলেন এবং কুরাইশদের সঙ্গে আলোচনা শুরু হলো।
রাসুলুল্লাহ ﷺ উসমান ইবনে আফফান (রা.)-কে মক্কায় পাঠালেন, যেন তিনি কুরাইশদের জানিয়ে দেন যে মুসলমানরা যুদ্ধ করতে আসেননি, শুধু উমরাহ পালন করতে এসেছেন। উসমান (রা.) মক্কায় গেলে তাঁর ফিরে আসতে দেরি হলো। তখন গুজব ছড়িয়ে পড়ল যে তাঁকে হত্যা করা হয়েছে।
বাইআতে রিদওয়ান
উসমান (রা.)-এর মৃত্যুর গুজব শুনে রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের একটি গাছের নিচে একত্র করলেন। সাহাবিরা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর হাতে অঙ্গীকার করলেন যে তাঁরা প্রয়োজনে দৃঢ়ভাবে পাশে থাকবেন এবং পিছু হটবেন না। এই অঙ্গীকারকে বাইআতে রিদওয়ান বলা হয়। “বাইআত” মানে অঙ্গীকার বা আনুগত্যের শপথ।
পরে জানা গেল, উসমান (রা.) নিহত হননি। কুরআনের সূরা আল-ফাতহে এই গাছের নিচে অঙ্গীকারকারীদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাঁদের প্রতি সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন। (সূরা আল-ফাতহ: ১৮)
আলোচনার পর সন্ধি
এরপর কুরাইশদের পক্ষ থেকে সুহাইল ইবনে আমর আলোচনার জন্য এলেন। দীর্ঘ আলোচনার পর রাসুলুল্লাহ ﷺ ও কুরাইশদের মধ্যে একটি সন্ধি হলো। জায়গাটির নাম অনুসারে একে হুদাইবিয়ার সন্ধি বলা হয়।
সন্ধির কয়েকটি শর্ত ছিল:
মুসলমানরা সে বছর উমরাহ না করেই মদিনায় ফিরে যাবেন।
পরের বছর তাঁরা উমরাহ করতে মক্কায় আসতে পারবেন এবং সেখানে তিন দিন থাকবেন।
উভয় পক্ষের মধ্যে দশ বছরের জন্য যুদ্ধবিরতি থাকবে—এমন শর্ত সীরাহর বর্ণনায় প্রচলিত।
আরবের গোত্রগুলো চাইলে মুসলমানদের সঙ্গে বা কুরাইশদের সঙ্গে মিত্রতা করতে পারবে।
সন্ধির কিছু শর্ত সাহাবিদের কাছে খুব কঠিন মনে হয়েছিল। বিশেষ করে, এত দূর এসে উমরাহ না করেই ফিরে যেতে হবে—এটি তাঁদের জন্য কষ্টের ছিল। তবুও রাসুলুল্লাহ ﷺ আল্লাহর নির্দেশ ও বৃহত্তর কল্যাণের ওপর ভরসা রেখে সন্ধি মেনে নিলেন।
আবু জান্দাল (রা.)-এর ঘটনা
সন্ধির আলোচনা শেষ হওয়ার সময় সুহাইল ইবনে আমরের ছেলে আবু জান্দাল (রা.) শিকল বাঁধা অবস্থায় মুসলমানদের কাছে এলেন। তিনি ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন এবং মক্কায় কষ্টের মধ্যে ছিলেন। কিন্তু সন্ধির শর্ত অনুযায়ী তাঁকে তাঁর পিতার কাছে ফিরিয়ে দিতে হলো। ঘটনাটি সাহাবিদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক ছিল।
রাসুলুল্লাহ ﷺ আবু জান্দাল (রা.)-কে ধৈর্য ধরতে বললেন এবং আল্লাহর সাহায্যের আশা রাখতে শেখালেন। এই কঠিন পরিস্থিতিতেও তিনি প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলেন। এর মাধ্যমে মুসলমানরা শিখলেন—কোনো চুক্তি করলে তা পালন করা জরুরি, যদিও তাৎক্ষণিকভাবে তা কঠিন মনে হয়।
ফিরে যাওয়া, কিন্তু পরাজয় নয়
রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের নিয়ে মদিনায় ফিরে গেলেন। তাঁরা সে বছর উমরাহ করতে পারেননি, কিন্তু সন্ধির ফলে যুদ্ধের আশঙ্কা কমল এবং শান্তিপূর্ণ পরিবেশে মানুষের সঙ্গে কথা বলা ও ইসলামের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার সুযোগ তৈরি হলো।
আল্লাহ তাআলা সূরা আল-ফাতহের শুরুতে এই ঘটনাকে “স্পষ্ট বিজয়” বলে উল্লেখ করেছেন। (সূরা আল-ফাতহ: ১) প্রথমে শর্তগুলো কঠিন মনে হলেও, পরবর্তী ঘটনাগুলোতে এই সন্ধির গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব দেখা যায়। পরের বছর মুসলমানরা চুক্তি অনুযায়ী উমরাহ পালন করেন।
🌱 শিশুদের জন্য আজকের শিক্ষা
কোনো বিষয় প্রথমে কঠিন বা মনমতো না হলেও ধৈর্য ধরতে হবে। শান্তিপূর্ণভাবে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করব, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করব এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখব।
📝 আজকের MCQ
১. হুদাইবিয়ার ঘটনা কোন হিজরি সালে ঘটেছিল?
ক) তৃতীয় হিজরি
খ) পঞ্চম হিজরি
গ) ষষ্ঠ হিজরি
ঘ) অষ্টম হিজরি
২. রাসুলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদের নিয়ে মক্কার পথে কেন গিয়েছিলেন?
ক) ব্যবসা করতে
খ) উমরাহ পালন করতে
গ) নতুন শহর তৈরি করতে
ঘ) যুদ্ধ শুরু করতে
৩. মুসলমানরা প্রায় কতজন সাহাবি নিয়ে যাত্রা করেছিলেন বলে সীরাহর প্রচলিত বর্ণনায় আছে?
ক) ৩০০ জন
খ) ৭০০ জন
গ) ১,৪০০ জন
ঘ) ১০,০০০ জন
৪. রাসুলুল্লাহ ﷺ কাকে কুরাইশদের কাছে পাঠিয়েছিলেন?
ক) উসমান ইবনে আফফান (রা.)
খ) বিলাল (রা.)
গ) সালমান আল-ফারসি (রা.)
ঘ) আবদুল্লাহ ইবনে জুবাইর (রা.)
৫. হুদাইবিয়ার সন্ধি অনুযায়ী মুসলমানরা সে বছর কী করেছিলেন?
ক) উমরাহ করে মদিনায় ফিরেছিলেন
খ) মক্কায় থেকে গিয়েছিলেন
গ) উমরাহ না করেই মদিনায় ফিরেছিলেন
ঘ) মদিনায় নতুন মসজিদ বানিয়েছিলেন